বরিশাল নগরীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী

বরিশাল নগরীর ব্যস্ততা, যানবাহনের কোলাহল আর আধুনিকতার দৌড়ে যখন একের পর এক হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো স্থাপনা, তখন বরিশাল নগরীর রাজা বাহাদুর সড়কের এক শান্ত কোণে এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। দেড়শ বছরের পুরোনো একটি কাঠের দোতলা বাড়ি, যার প্রতিটি দেয়াল, বারান্দা ও কাঠের কারুকাজ যেন বলে যায় অতীতের অগণিত গল্প।
নগরবাসীর কাছে ‘চান বাংলো’ নামে পরিচিত এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি শুধু একটি পুরোনো বাড়ি নয়; বরং ব্রিটিশ শাসনামল, নদীকেন্দ্রিক বাণিজ্যের বিকাশ, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের এক জীবন্ত দলিল।
গাছপালায় ঘেরা ছায়াময় পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটির সামনে রয়েছে শ্বেতপদ্মে ভরা একটি মনোরম পুকুর। পুকুরের স্থির জল আর কাঠের দোতলা ভবনের প্রতিচ্ছবি মিলে সৃষ্টি করেছে এক অপূর্ব দৃশ্য। দূর থেকে এটি হয়তো সাধারণ কোনো পুরোনো বাড়ি বলে মনে হতে পারে, কিন্তু একটু কাছে গেলেই চোখে পড়ে শতবর্ষী স্থাপত্যশৈলীর নিখুঁত ছাপ। কাঠের দেয়াল, প্রশস্ত বারান্দা আর নান্দনিক নির্মাণকৌশল ভবনটিকে দিয়েছে আলাদা মর্যাদা।
ভবনের ভেতরে পা রাখতেই যেন সময় পিছিয়ে যায় কয়েক দশক। চারপাশের সবুজ প্রকৃতি, পাখির কলতান আর নির্জন পরিবেশ দর্শনার্থীদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ইতিহাসের পাতায়। আধুনিক নগর জীবনের ব্যস্ততার বাইরে এই স্থানটি এখনও আগলে রেখেছে অতীতের আবহ।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে দক্ষিণাঞ্চলের নদীপথভিত্তিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র ছিল বরিশাল। সেই সময় এই এলাকাটি ছিল স্টিমার কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমের অংশ। এখানে জাহাজ মেরামত ও পরিচালনাসহ বিভিন্ন নৌবাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত ব্রিটিশ স্টিমার কোম্পানি আরএসএমের কার্যালয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে ভবনটি।
তবে এই বাড়ির ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় জড়িয়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে।
স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ৯ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর এম এ জলিল এই ভবনে ক্যাম্প স্থাপন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে নানা কৌশলগত পরিকল্পনা, বৈঠক এবং যুদ্ধ পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের নীরব সাক্ষী ছিল এই কাঠের দোতলা বাড়ি।
স্বাধীনতার পরও ভবনটির গুরুত্ব কমেনি। বরং প্রশাসনিক নানা কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এটি। ১৯৭৯ সালে বরিশাল সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে বরিশালের উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জিয়াউর রহমান। সেই কর্মসূচির অন্যতম সিদ্ধান্ত ছিল বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর কার্যক্রম বরিশালে স্থানান্তর করা। পরবর্তীতে সংস্থাটির বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সচিবালয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে এই ভবন।
ইতিহাসবিদ ও লেখক বুলবুল আহমেদ মনে করেন, এই বাড়িটি বরিশালের ঐতিহাসিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার ভাষায়, এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়; বরং নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি, ঔপনিবেশিক শাসন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রশাসনিক ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষ্য। এমন স্থাপনা সংরক্ষণ করা মানে আমাদের ইতিহাস ও উত্তরাধিকারকে সংরক্ষণ করা।
বর্তমানে ভবনটি বিআইডব্লিউটিএর গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিদিন ইতিহাসপ্রেমী মানুষ, গবেষক, শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। কেউ জানতে চান অতীতের অজানা গল্প, কেউ মুগ্ধ হন পুরোনো স্থাপত্যের সৌন্দর্যে, আবার কেউ শ্বেতপদ্মে ভরা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন প্রশান্তির মুহূর্ত।
সময়ের স্রোতে বদলে গেছে বরিশালের নগরচিত্র। নতুন নতুন ভবন আর আধুনিক স্থাপনার ভিড়ে হারিয়ে গেছে অনেক স্মৃতি। কিন্তু রাজা বাহাদুর সড়কের এই দেড়শ বছরের পুরোনো কাঠের বাড়িটি এখনও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে অতীতকে বুকে ধারণ করে। তার কাঠের দেয়ালে লেগে আছে ব্রিটিশ আমলের পদচারণা, তার বারান্দায় প্রতিধ্বনিত হয় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, আর তার প্রতিটি কাঠামো যেন বলে যায় বরিশালের দীর্ঘ ইতিহাসের গল্প।
তাই ‘চান বাংলো’ কেবল একটি পুরোনো কাঠের বাড়ি নয়; এটি বরিশালের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং গৌরবের এক জীবন্ত স্মারক, যা আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
এইচকেআর