ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

Motobad news

সব চোখ আজ রোনালদোর ওপর

সব চোখ আজ রোনালদোর ওপর
ছবি: সংগৃহীত 
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

ফুটবল মূলত যৌবনের খেলা এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বয়স ৪১।

একসময়কার অগ্নিময় রোনালদো তাই আজ নিজের ফেলে আসা যৌবনের মুখোমুখি।

আসলে আজ মুখোমুখি হচ্ছে পর্তুগাল-উজবেকিস্তান। তবে হিউস্টনে বিশ্বকাপের ‘কে’ গ্রুপে এই ম্যাচের আগে পুরো ফুটবল বিশ্বের সব আলো, সব ক্যামেরা এবং সব উৎকণ্ঠা গিয়ে আছড়ে পড়েছে একটি মাত্র মানুষের ওপর—ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো।

প্রথম ম্যাচে ডিআর কঙ্গোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে অপ্রত্যাশিত ধাক্কা খেয়েছে পর্তুগাল। যে দলকে অনেকে নিউ জার্সির ফাইনালে দেখছিলেন, তাদের শুরুটা এত ম্লান, এত নিরুত্তাপ! দায়টা রোনালদোর ওপরই পড়েছিল। পড়ারই কথা।

ওই ম্যাচে ৯০ মিনিটে বল ছুঁয়েছেন মাত্র ২৫ বার। পুরো ম্যাচ খেলেও মাঠে সবচেয়ে কম স্পর্শ! গোলের হুমকি? নেই। প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভাঙার চেষ্টা? সেটাও প্রায় অনুপস্থিত। এটা শুধু একটা ম্যাচের গল্প নয়। বড় টুর্নামেন্টে (বিশ্বকাপ ও ইউরো) সর্বশেষ ১০ ম্যাচে একটিও গোল নেই রোনালদোর। তিনি এখন যেন সেই শিল্পী, যাঁর তুলির আঁচড়গুলো স্রেফ স্মৃতি হয়ে গেছে!

বিতর্কটাও কেবল পারফরম্যান্সে আটকে নেই, হয়ে উঠেছে এক দেশের আবেগের প্রশ্ন। লিসবনের মেট্রোতে, পার্কে কিংবা পাবে একটাই আলোচনা: রোনালদো কি এখনো শুরুর একাদশে থাকার যোগ্য? কয়েক বছর আগে এমন প্রশ্ন উচ্চারণ করাই প্রায় রাষ্ট্রদ্রোহ ছিল। কিন্তু সত্য একসময় স্বাভাবিক বানিয়ে দেয় সবকিছু।

পর্তুগাল কোচ এখনো রোনালদোকে শুরুর একাদশে রাখছেন। পুরো ৯০ মিনিট খেলাচ্ছেন। যেন সময়কে জোর করে পেছনে টানার চেষ্টা। কিন্তু সময় তো নদী, পেছনে ফেরে না।

অথচ এই পর্তুগাল দল মোটেই রোনালদোনির্ভর নয়। ভিতিনিয়া, ব্রুনো ফের্নান্দেজ, জোয়াও নেভেস...। মিডফিল্ডে কী গতি, কী সৃজনশীলতা আর নিয়ন্ত্রণ! তবু কেন এই নির্ভরতা? সম্ভবত ইতিহাসের ভার।

কারণ, রোনালদো শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি এক দেশের প্রতীক। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে ‘পর্তুগাল’ বললেই যে নামটি প্রথম আসে, সেটা রোনালদো। তাঁর গোল, তাঁর উদ্‌যাপন, তাঁর জেদ, সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এক চলমান পরিচয়পত্র। পর্তুগালে তিনি এক আবেগের নাম। কিন্তু আজ সেই আবেগই যেন প্রশ্ন তুলছে।

কঙ্গোর মিডফিল্ডার এনগাল’আয়েল মুকাউ সেদিন ম্যাচ শেষে বলেছিলেন, ‘তিনি আগের মতো নেই। বয়স হয়েছে।’ একসময় কেউ এমন কথা বলার সাহসই পেত না।

আজ সেটা যে কেউ এসে বলে দিচ্ছে।

দায় কি শুধু রোনালদোর? পুরোপুরি নয়। একজন ফুটবলারের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো খেলতে চাওয়া। বিশেষ করে এমন একজন, যার ক্যারিয়ারজুড়ে প্রতিযোগিতার আগুন কখনো নেভেনি। দায়টা বরং সিস্টেমের, কোচিং স্টাফের। আর হয়তো তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের, যারা সত্যিটা সামনে আনতে পারছে না। কারণ, কখনো কখনো সবচেয়ে কঠিন কথাটা হলো, ‘এখন তোমার একটু পেছনে সরে দাঁড়ানোর সময়।’

২০২২ বিশ্বকাপে ফার্নান্দো সান্তোস সেই সাহস দেখিয়েছিলেন। রোনালদোকে বেঞ্চে রেখেছিলেন। সেটাই ছিল প্রথম বড় সংকেত—অপরাজেয়তার মিথ ভাঙার। কিন্তু নতুন কোচ আসার পর আবার যেন পুরোনো চিত্রনাট্যে ফিরে গেছে পর্তুগাল।

আজ উজবেকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটা তাই পর্তুগালের জন্য শুধু ৩ পয়েন্টের নয়। এমনিতে পর্তুগালের জন্য এই ম্যাচে জয় ছাড়া খুব একটা বিকল্প নেই। উজবেকিস্তানকে হারাতে না পারলে গ্রুপ থেকে নকআউটে ওঠা কঠিন হয়ে যাবে। তবে রোনালদোর জন্য আজকের ম্যাচ যেন এক শেষ সুযোগ—নিজেকে প্রমাণ করার, নিজের উত্তরাধিকারকে রক্ষা করার।

সেটা রোনালদো করতেই পারেন। কারণ, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে এই ৪১ বছর বয়সেও তিনি অলৌকিক কিছু ঘটিয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখেন। কিন্তু যদি সে রকম কিছু না হয়, তাহলে রোনালদোর সামনে দুটো পথ। এক. সময়কে অস্বীকার করে লড়াই চালিয়ে যাওয়া। দুই. সময়কে মেনে নিয়ে নিজের ভূমিকাটা বদলে ফেলা। দ্বিতীয় পথটা হয়তো বেশি কঠিন। কিন্তু সেটাই হয়তো বেশি যৌক্তিক।

কিংবদন্তিরা শুধু মাঠে নন, সিদ্ধান্তেও বড় হন। হিউস্টনের আলো আজ তাই কেবল একটি ম্যাচ দেখবে না। দেখবে এক মানুষের লড়াই, নিজের সঙ্গেই।


এইচকেআর
গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন