৫৪ বছর পর চাঁদে যাচ্ছে মানুষ

ফ্লোরিডার কেনেডি মহাকাশ কেন্দ্রে শুরু হয়েছে কাউন্টডাউন। বহু প্রতীক্ষিত আর্টেমিস-২ উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি এখন শেষ পর্যায়ে। এই অভিযানে চারজন নভোচারীকে চাঁদের চারপাশে ঘুরিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হবে। ১৯৭২ সালের পর এটিই হবে মানুষের অংশগ্রহণে প্রথম চন্দ্র অভিযান।
সোমবার মিশন ব্যবস্থাপনা দলের বৈঠকের পর মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র সহযোগী প্রশাসক অমিত ক্ষত্রিয় জানান, আর্টেমিস-২ উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত রয়েছে ও বুধবারই (১ এপ্রিল) তা উৎক্ষেপণ করা সম্ভব। তবে আবহাওয়া এখনো একটি বড় বিবেচ্য বিষয়।
সংস্থাটি জানিয়েছে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী অনুকূল পরিবেশের সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ। তবে মেঘের উপস্থিতি ও ঝোড়ো বাতাস উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
কবে উৎক্ষেপণ হবে?
বুধবার (১ এপ্রিল) বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটে উৎক্ষেপণের জন্য দুই ঘণ্টার একটি সময়সীমা শুরু হবে। ফ্লোরিডার কেনেডি মহাকাশ কেন্দ্র থেকেই মহাকাশযানটি উৎক্ষেপণ করা হবে।
সূর্যাস্তের পর প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে সোমবার (৬ এপ্রিল) পর্যন্ত এই সময়সীমা খোলা থাকবে। তবে চাঁদের অবস্থান, কক্ষপথ, আবহাওয়া ও পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে সবকিছু নিরাপদভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেই কেবল উৎক্ষেপণ সম্ভব হবে।
উৎক্ষেপণে দেরি হওয়ার কারণ
মূলত ২০২৬ সালের শুরুর দিকে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা থাকলেও দুটি বড় সমস্যার কারণে তা পিছিয়ে যায়। ফেব্রুয়ারির শুরুতে মহড়া চলাকালে তরল হাইড্রোজেন গ্যাসের লিক ধরা পড়ায় প্রথম প্রচেষ্টা বাতিল করা হয়। এরপর মার্চের শুরুতে দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও বাতিল করা হয়, যখন প্রকৌশলীরা রকেটের ওপরের ধাপে হিলিয়াম প্রবাহের সমস্যার সন্ধান পান।
যেভাবে দেখা যাবে উৎক্ষেপণ
মহাকাশ গবেষণা সংস্থা তাদের নিজস্ব মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করবে। এর আগে যান সংযোজন ভবন থেকে উৎক্ষেপণ প্যাড পর্যন্ত পুরো প্রস্তুতি ধাপও সরাসরি দেখানো হয়েছে।
আর্টেমিস প্রোগ্রাম কী?
আর্টেমিস প্রোগ্রাম হলো মানুষের আবার চাঁদে ফেরার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ১৯৭২ সালের পর প্রথমবার মানুষের চাঁদে ফেরা, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি ঘাঁটি স্থাপন ও ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানুষের অভিযান চালানোর পথ তৈরি করাই এর লক্ষ্য।
এই কর্মসূচি বর্তমানে পাঁচটি ধাপে বিভক্ত, আর্টেমিস-১, ২, ৩, ৪ ও ৫।
আর্টেমিস-১ ছিল প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন, যেখানে কোনো মানুষ ছিল না। ২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর উৎক্ষেপণ হয়ে ২৫ দিন স্থায়ী এই অভিযানে ওরিয়ন মহাকাশযানকে পৃথিবীর কক্ষপথে স্থাপন করা হয় এবং আর্টেমিস-২-এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
আর্টেমিস-২ কী?
আর্টেমিস-২ হলো এই কর্মসূচির প্রথম মানববাহী অভিযান। আর্টেমিস-১ যেখানে কেবল পরীক্ষামূলকভাবে পুতুল ও বিভিন্ন যন্ত্র বহন করেছিল, সেখানে আর্টেমিস-২ এ প্রথমবার ১৯৭২ সালের পর নভোচারীরা নিম্ন পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে ভ্রমণ করবেন।
আর্টেমিস-২ কি চাঁদে নামবে?
না, এই অভিযানে চারজন নভোচারী চাঁদে নামবেন না। তারা চাঁদের দূরবর্তী অংশ ঘুরে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।
মূল লক্ষ্য কী?
এই অভিযান মূলত একটি পরীক্ষামূলক যাচাই মিশন। এতে ওরিয়ন মহাকাশযানের জীবনধারণ ব্যবস্থা, নেভিগেশন, যোগাযোগ ও গভীর মহাকাশে সামগ্রিক কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করা হবে, যা পৃথিবীতে পুরোপুরি পরীক্ষা করা সম্ভব নয়।
এই মিশন সফল হলে পরবর্তী ধাপগুলো এগিয়ে যাবে। আর্টেমিস-৩ এ নিম্ন পৃথিবীর কক্ষপথে মানববাহী অভিযান, আর্টেমিস-৪ এ চাঁদে অবতরণ ও ভবিষ্যতে স্থায়ী মানব উপস্থিতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
১০ দিনের যাত্রাপথ
এই অভিযানের পুরো যাত্রা প্রায় ১০ দিন স্থায়ী হবে। যেসব ধাপে শেষ হবে এই অভিযান-
উৎক্ষেপণের দুই মিনিট পর বুস্টার বিচ্ছিন্ন হবে।
ছয় মিনিট পর মূল ধাপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সৌর প্যানেল খুলবে।
৯০ মিনিট পর কক্ষপথ বাড়াতে ইঞ্জিন চালু হবে এবং ২৪ ঘণ্টা ধরে সিস্টেম পরীক্ষা চলবে।
এরপর ওরিয়ন আলাদা হয়ে হাতে নিয়ন্ত্রণের অনুশীলন করা হবে।
২৩ ঘণ্টা পর চাঁদের পথে যাত্রা শুরু হবে, যা প্রায় চার দিন সময় নেবে।
চাঁদের চারপাশ ঘুরে আবার চার দিনে পৃথিবীতে ফেরা শুরু হবে।
পুনঃপ্রবেশের আগে ক্রু মডিউল আলাদা হবে।
পৃথিবীতে প্রবেশের সময় গতিবেগ হবে ঘণ্টায় প্রায় ৩২ হাজার ১৮৭ কিলোমিটার এবং তাপমাত্রা ২ হাজার ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠবে।
প্যারাসুট খুলে গতি কমিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করা হবে।
অ্যাপোলো কর্মসূচির সঙ্গে পার্থক্য
গ্রিক পুরাণে আর্টেমিস চাঁদের দেবী ও অ্যাপোলোর যমজ বোন। নামটি আগের অ্যাপোলো কর্মসূচির সঙ্গে সংযোগ নির্দেশ করে, যা ১৯৬১ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত পরিচালিত হয়েছিল।
এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল অ্যাপোলো-১১, যখন ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদে পা রাখেন।
শেষ অভিযান ছিল অ্যাপোলো-১৭, যেখানে ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর ইউজিন সার্নান ও হ্যারিসন শ্মিট চাঁদের মাটি ত্যাগ করেন এবং তারাই এখন পর্যন্ত শেষ মানুষ, যারা চাঁদে হেঁটেছেন।
কারা যাচ্ছেন এই অভিযানে
এই অভিযানে চারজন নভোচারী থাকবেন।
রিড উইজম্যান, বয়স ৫০। অভিযানের কমান্ডার। তিনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের সাবেক কমান্ডার।
ভিক্টর গ্লোভার, বয়স ৪৯। পাইলট ও প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী হিসেবে চন্দ্র অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।
ক্রিস্টিনা কচ, বয়স ৪৭। একজন নারী হিসেবে একটানা ৩২৮ দিন মহাকাশে থাকার রেকর্ডধারী।
জেরেমি হ্যানসেন, বয়স ৫০। প্রথম কানাডীয় হিসেবে চাঁদের পথে যাত্রা করবেন।
তারা কী করবেন
এই অভিযানে নভোচারীরা মহাকাশযানের কার্যকারিতা যাচাই করবেন, বিকিরণ ও অগ্নিকাণ্ডের পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করবেন ও পোশাকের চাপ পরীক্ষা চালাবেন।
তারা চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষাও চালাবেন ও চাঁদের পৃষ্ঠ সম্পর্কে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করবেন।
কেন আবার চাঁদে যাওয়া
এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদে চাঁদে মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, বিশেষ করে দক্ষিণ মেরু এলাকায় যেখানে বরফ আকারে পানির অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
এটি ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানুষের অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবেও কাজ করবে। একই সঙ্গে মহাকাশ গবেষণায় নেতৃত্ব ধরে রাখতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটেও এই কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বিষয়টি সামনে রেখে।
পরবর্তী সব অভিযান
আর্টেমিস-৩: ২০২৭ সালে নির্ধারিত। এতে চাঁদে নামার পরিবর্তে নিম্ন পৃথিবীর কক্ষপথে মহাকাশযানের সমন্বিত কার্যক্রম পরীক্ষা করা হবে।
আর্টেমিস-৪: ২০২৮ সালের শুরুতে পরিকল্পিত। এতে চাঁদের কক্ষপথে গিয়ে দুই নভোচারীকে দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করানো হবে।
আর্টেমিস-৫: ২০২৮ সালের শেষ দিকে পরিকল্পিত। এতে দ্বিতীয়বারের মতো মানুষ চাঁদে অবতরণ করবে এবং একটি স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপনের কাজ শুরু হবে।
সূত্র: আল-জাজিরা
এইচকেআর