উপকূলের ‘লাইফলাইন’ বেতার বরিশাল নিজেই লাইফ সাপোর্টে

দক্ষিণাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ। দুর্যোগের মুহূর্তে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও সচল থাকে বেতারের তরঙ্গ। আর সেই কারণেই দীর্ঘদিন ধরে উপকূলবাসীর কাছে আস্থার নাম হয়ে উঠেছে রেডিও বরিশাল।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, যে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবনরক্ষার কথা ভেবেই এই বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, আজ তারাই কার্যকর সম্প্রচার সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পুরোনো ট্রান্সমিটার, দুর্বল ফ্রিকুয়েন্সি এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় রেডিও বরিশালের সম্প্রচার এখন অনেকটাই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে নগরকেন্দ্রিক পরিসরে। ফলে দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছাচ্ছে না উপকূলের বিস্তীর্ণ জনপদে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার আগাম বার্তা পৌঁছে দেয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭৮ সালে বরিশালে বেতার কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে ১৯৯৬ সালের ৩০ জুন পরীক্ষামূলক সম্প্রচার শুরু করে কেন্দ্রটি। পরে ১৯৯৯ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়।
শুরুর দিকে দুর্যোগকালীন তথ্যপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন না হওয়ায় কেন্দ্রটির কার্যকারিতা এখন প্রশ্নের মুখে। বর্তমানে এখানে ২০ কিলোওয়াট ক্ষমতার মিডিয়াম ওয়েভ এবং ১০ কিলোওয়াটের এফএম ট্রান্সমিটার রয়েছে। প্রতিদিন ১৪ ঘণ্টা ১৫ মিনিট অনুষ্ঠান সম্প্রচার হলেও দুর্বল সিগন্যালের কারণে তা বরিশাল নগরী ও আশপাশের ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
অথচ যেসব উপকূলীয় চরাঞ্চল ও সাগরপাড়ের মানুষ দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, তাদের অনেকেই এই সম্প্রচার শুনতেই পান না। বিশেষ করে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের জন্য দুর্যোগের আগাম বার্তা পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও দুর্বল সম্প্রচারব্যবস্থার কারণে তারা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সম্প্রতি কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর এফএম ট্রান্সমিটার পুনরায় চালু করা হলেও এর কার্যক্ষমতা আগের তুলনায় আরও কমেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ কার্যত রেডিও বরিশালের সেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি শাহ সাজেদা বলেন, রেডিও বরিশাল শুধু একটি বেতার কেন্দ্র নয়, দুর্যোগের সময় এটি দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনরক্ষাকারী মাধ্যম। তাই দ্রুত এটিকে আধুনিকায়ন ও কার্যকর করা জরুরি।
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও গবেষক আনিচুর রহমান স্বপন বলেন, দুর্যোগের সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে গেলেও বেতার সচল থাকে। তাই এই মাধ্যমকে আরও শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাবের কারণেই আজ এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু নতুন ট্রান্সমিটার স্থাপন করলেই হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত আধুনিকায়ন পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল তৈরি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে শক্তিশালী সম্প্রচারব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর উপকূলের বাসিন্দা ও সাগরে থাকা জেলেদের কাছে বাংলাদেশ বেতার এখনো নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। কিন্তু সিগন্যাল দুর্বল হলে সেই জরুরি বার্তা প্রত্যন্ত উপকূল পর্যন্ত পৌঁছাবে না, যা বড় ধরনের মানবিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন রেডিও বরিশাল কেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় সুধীজনরা কেন্দ্রটির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের দাবি জানান। তারা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সমিটার স্থাপন এবং সম্প্রচার পরিসর বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এ সময় মন্ত্রী উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে দ্রুত দুর্যোগের সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে রেডিও বরিশালের ফ্রিকুয়েন্সি বাড়ানোর আশ্বাস দেন। পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
তবে মন্ত্রীর সফরের পরপরই কেন্দ্রটির পরিচালক ও আঞ্চলিক প্রকৌশলীকে ঢাকায় বদলি করা হয়েছে। সদ্য বিদায়ী আঞ্চলিক প্রকৌশলী শামীম হোসেন জানিয়েছেন, নতুন ১০ কিলোওয়াট এফএম ট্রান্সমিটার স্থাপনের জন্য শিগগিরই দরপত্র আহ্বান করা হবে।
দক্ষিণাঞ্চলের সচেতন মহলের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে উপকূলীয় মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ভবিষ্যতে আরও অকার্যকর হয়ে পড়বে। আর দুর্যোগের সময় তৈরি হতে পারে ভয়াবহ তথ্য সংকট, যার মূল্য দিতে হতে পারে লাখো মানুষকে।
এইচকেআর