র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠন, এপিবিএনের ক্ষমতা বৃদ্ধি

জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে (কণ্ঠভোটে) দুটি আইন পাস হয়েছে। এর মাধ্যমে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠন করা হয়েছে এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তদন্তের পরিধি সম্প্রসারিত করা হয়েছে।
অবশ্য বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা (এমপি) এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে সতর্ক করেছেন যে, নতুন এই বাহিনী কার্যত ভিন্ন নামে র্যাবেরই রূপ নিতে পারে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিল দুটি সংসদে উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর বিল দুটি সংসদে তোলা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়।
কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধীদলের সদস্যদের আপত্তির কথা (নোট অব ডিসেন্ট) অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করে বলেন, নতুন নামে একই ধরনের বাহিনী তৈরি করা জনগণ কিংবা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা পূরণ করবে না। স্থায়ী কমিটির বিরোধীদলীয় সদস্যরা সাতটি প্রধান আপত্তি তুলে ধরে যুক্তি দেন যে, বিলে প্রথমে র্যাব বিলুপ্ত করে আলাদাভাবে নতুন বাহিনী গঠনের স্পষ্ট বিধান রাখা হয়নি। উল্টো বিলে ধারা ২৭(৩) অনুযায়ী—র্যাবের জনবল, স্থাপনা, ক্ষমতা, নথিপত্র, সম্পত্তি, চুক্তি এবং দায়দেনা সরাসরি এসআরবি-তে স্থানান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তারা সতর্ক করে বলেন, এসআরবির বিধিমালা, তদারকি ও পরিচালন প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তন না আনলে বিদেশি সরকারগুলো এটিকে র্যাবেরই রূপান্তর হিসেবে দেখতে পারে, যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে।
এছাড়া বিরোধী আইনপ্রণেতারা অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে র্যাবের শারীরিক ও ইলেকট্রনিক নথিপত্রের সুরক্ষা, যথাযথ সংরক্ষণ, তালিকাভুক্তকরণ এবং কোনো ধরনের পরিবর্তন বা ধ্বংস থেকে সুরক্ষার জন্য আরও কঠোর ব্যবস্থার দাবি জানান।
তারা প্রস্তাবিত অভিযোগ প্রতিকার কমিটির স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন (ধারা ২৪)। কারণ এই কমিটির চেয়ারম্যান হবেন এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং সদস্য সচিব হবেন আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক। এর পরিবর্তে তারা প্রস্তাব করেন যে, প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত হাইকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে এই কমিটি গঠন করা উচিত, যেখানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
বিরোধীদল এসআরবির গ্রেফতার, তল্লাশি, বাজেয়াপ্তকরণ ও ফৌজদারি তদন্তের ক্ষমতার ক্ষেত্রে আরও বেশি বাহ্যিক তদারকি এবং বেসামরিক নাগরিকদের আটক রাখার বিষয়ে স্পষ্ট সুরক্ষাকবচের দাবি জানায়।
এসব আপত্তির জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইন পাসের পরই র্যাব বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং এরপর নতুন ব্যাটালিয়ন হিসেবে এসআরবি গড়ে তোলা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই দুই বাহিনীর মধ্যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক থাকবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জনগণের সম্পদের অপচয় রোধ করতেই র্যাবের অস্ত্র, সরঞ্জাম, গোয়েন্দা তথ্য ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি এসআরবিতে হস্তান্তর করা হবে। নতুন সরঞ্জাম কেনার বদলে সরকার বিদ্যমান সম্পদ পুনর্ব্যবহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিকায়ন করবে।
র্যাবের নথিপত্র সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়ে তিনি বলেন, নথিপত্র হস্তান্তর একটি বিধিসম্মত প্রক্রিয়া এবং তা নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন হবে। প্রস্তাবিত অভিযোগ প্রতিকার কমিটির পক্ষে যুক্তি দিয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, এটি ফৌজদারি অপরাধের জন্য নয়, বরং বিভাগীয় ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয়াদি মোকাবিলার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ উঠলে তা প্রচলিত আইনেই বিচার করা হবে।
র্যাব বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করে সালাহউদ্দিন বলেন, ২০০৩-০৪ সালে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনের একটি ধারার অধীনে অ্যাডহক (অস্থায়ী) ভিত্তিতে র্যাব গঠন করা হয়েছিল এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর আইনি কাঠামোয় নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দেয়। তাই নতুন আইনের মাধ্যমে র্যাবকে এপিবিএন কাঠামো থেকে সরিয়ে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
এসআরবি কেবল নতুন নামের র্যাব—এমন যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের পরিচালনগত প্রয়োজন এবং সমাজের পরিবর্তনশীল চাহিদা মেটাতেই এই নতুন বাহিনী গঠন করা হচ্ছে।
এপিবিএন বিল
এপিবিএন বিল পাসের মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স’ রদ (বাতিল) করে বাংলায় একটি নতুন আইনি কাঠামো চালু করা হলো এবং এখান থেকে র্যাব সংক্রান্ত বিধানগুলো বাদ দেওয়া হলো। নতুন আইনটিতে স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, মাউন্টেন (ট্যুরিস্ট) ব্যাটালিয়ন এবং বিমানবন্দর ব্যাটালিয়নের মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলোকে এপিবিএন কাঠামোর অধীনে আনা হয়েছে।
এর মাধ্যমে এপিবিএনের দায়িত্বের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার, মানব পাচার, ধর্ষণ, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সাইবার অপরাধ, গুম এবং জমি দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাহিনীকে কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে।
এপিবিএন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মনোনীত ভিআইপিদের নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় সহায়তা করবে। এই প্রথমবারের মতো এই বাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC, ১৮৯৮) এবং পুলিশ রেগুলেশন (PRB, ১৯৪৩) অনুযায়ী ন্যূনতম সাব-ইনস্পেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনা করতে হবে।
তদন্তের প্রয়োজনে এপিবিএনকে ডিটেনশন সেল (আটক কেন্দ্র), ব্যারাক ও জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্র পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছে আইনটিতে। এপিবিএন মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সামগ্রিক তত্ত্বাবধানে একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) অধীনে পরিচালিত হবে। এপিবিএন সদর দপ্তরে একটি সাইবার সেল এবং গবেষণা ইউনিট স্থাপন করা হবে।
অপারেশনাল চাহিদা অনুযায়ী সরকার বাইরে থেকে পুলিশ বাহিনীর বাইরের পেশাজীবীদের—যেমন আইনজীবী, মনোবিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও বিচারকদের চুক্তিভিত্তিক বা প্রেষণে নিয়োগ দিতে পারবে। বাহিনীতে যোগদানের পর সব সদস্যের জন্য প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নতুন আইনে ১৯৭৯ সালের পুলিশ-নিয়ন্ত্রিত আদালত কাঠামোর পরিবর্তে এপিবিএনের বিশেষ ও আপিল আদালতে বিচার বিভাগীয় সদস্যদের অংশগ্রহণের সুযোগ যুক্ত করা হয়েছে। এপিবিএনের সংক্ষিপ্ত আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে এবং বিশেষ এপিবিএন আদালতের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল দায়ের করতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ক্রসফায়ারের অভিযোগ এনে রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বহু বছরের দাবির মুখেই সরকার শেষ পর্যন্ত র্যাব বিলুপ্তির এই পদক্ষেপ নিল।
এইচকেআর