বরিশালে ব্যাটারিচালিত রিকশা শ্রমিকদের সমাবেশ

আদালত ও সরকারের নির্দেশনার পর ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চূড়ান্ত নীতিমালা যখন আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এর পেছনের “ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট” ও “উচ্ছেদ পরিকল্পনা” নিয়ে তীব্র ক্ষোভ দানা বেঁধেছে রিকশা ও ইজিবাইক চালকদের মধ্যে। বিআরটিএ ও স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে কোনো করপোরেট স্বার্থ ছাড়াই একটি সর্বজনীন ‘শ্রমিকবান্ধব নীতিমালার’ দাবিতে সরব হয়ে উঠেছে রাজপথ।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে বরিশালের অশ্বিনী কুমার হলচত্বরে রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে এক বিশাল গণসমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
সংগ্রাম পরিষদের সংগঠক এবং বরিশাল রিকশা-ভ্যান চালক-শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি দুলাল মল্লিকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব ও বাসদ বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী।
সমাবেশে ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তীসহ অন্যান্য বক্তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘ ১৩ বছরের ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখে সরকার অবশেষে নীতিমালা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিলেও তার আড়ালে চক্রান্ত লুকিয়ে আছে। প্রস্তাবিত খসড়ায় দেশের প্রায় ৬০ লাখ বিদ্যমান গাড়ি উচ্ছেদ করে নির্দিষ্ট কিছু বড় কোম্পানির কাছ থেকে চড়া দামে গাড়ি কিনতে বাধ্য করার চক্রান্ত চলছে।
বক্তারা বলেন, “আমরা বিআরটিএ ও স্থানীয় সরকারের সমন্বয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা চাই। কিন্তু সেই নীতিমালা হতে হবে সাধারণ শ্রমিকের স্বার্থে, কোনো ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের পকেট ভরার জন্য নয়। সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে চার্জ দেওয়াকে বাধ্যতামূলক করা এবং ব্যয়বহুল লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারে সরকারি ভর্তুকি না দিয়ে চালকদের ওপর চাপিয়ে দেয়া এক ধরনের নির্যাতন।”
আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত ৮ দফা দাবি:
১. আইনি স্বীকৃতি: বিআরটিএ ও স্থানীয় সরকারের সমন্বিত নীতিমালার মাধ্যমে দ্রুত রিকশা ও ইজিবাইকের নিবন্ধন, রুট পারমিট ও চালকদের লাইসেন্স প্রদান।
২. স্থানীয় শিল্প রক্ষা: কোনো সিন্ডিকেটকে একচেটিয়া সুযোগ না দিয়ে, সরকারি অনুমোদিত ডিজাইনে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনের অনুমতি দেয়া।
৩. আধুনিকায়ন ও সময় সীমা: যানবাহনের কারিগরি ত্রুটি সংশোধনে সরকারি ভর্তুকি ও কমপক্ষে ২ বছরের সময় দেওয়া; এ সময়ে কোনো উচ্ছেদ অভিযান না চালানো।
৪. অবকাঠামো উন্নয়ন: সিটি কর্পোরেশন ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পর্যাপ্ত পারকিং ও চার্জিং স্টেশন নির্মাণ এবং লিথিয়াম ব্যাটারিতে ভর্তুকি।
৫. অযৌক্তিক শর্ত বাতিল: লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যয়বহুল সৌর বিদ্যুতের শর্ত প্রত্যাহার।
৬. হাইওয়েতে পৃথক লেন: মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য অবিলম্বে সার্ভিস রোড নির্মাণ।
৭. নিরাপত্তা ও চাঁদাবাজি বন্ধ: বিট বাণিজ্য, অবৈধ চাঁদাবাজি, রিকশা চুরি বন্ধ করা এবং নারী চালকদের নিরাপত্তা জোরদার করা।
৮. সন্ত্রাসী হামলার বিচার: গাইবান্ধায় সংগ্রাম পরিষদের সংগঠক ও বাসদ নেতা গোলাম রাব্বানীর ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদ ও দায়ীদের দ্রুত গ্রেপ্তার।
সমাবেশে বরিশাল নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড ও স্ট্যান্ড থেকে আসা সহস্রাধিক শ্রমিকের সমাগম ঘটে। একপর্যায়ে নগরীর ব্যস্ততম সদর রোডে যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সমাবেশ শেষে একটি বিশালাকার বিক্ষোভ মিছিল নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
পরবর্তীতে সংগ্রাম পরিষদের একটি প্রতিনিধি দল জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ৮ দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি পেশ করেন।
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট বরিশাল জেলা শাখার দপ্তর সম্পাদক শহিদুল ইসলাম, চালক-শ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা শহিদুল ইসলাম, মহসিন মিড়া, সহ-সভাপতি মনির হোসেন সর্দার, সাংগঠনিক সম্পাদক শহিদুল হাওলাদার, দপ্তর সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, প্রচার সম্পাদক আরিফুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ আব্দুল মানিক হাওলাদার, সংগঠক রমজান আকন, কবির খান, আইউব আলী তালুকদার এবং আব্দুল মান্নান মল্লিক। এছাড়াও সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন গ্লোবাল ক্যাপসুল ফার্মাসিউটিক্যালস শ্রমিক ইউনিয়নের (প্রস্তাবিত) সভাপতি জাহিদুল ইসলাম শাহাদাত ও অলিম্পিক সিমেন্ট শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সেলিম সর্দার।
এইচকেআর