ভোলায় চরে প্রসববেদনা মানেই আতঙ্ক, খেয়া না পেলে অনিশ্চিত জীবন

ভোলা জেলার তজুমদ্দিন উপজেলার বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলে কোনো প্রসূতি নারীর প্রসবব্যথা উঠলেই পরিবারে নেমে আসে উৎকণ্ঠা। আশপাশে নেই হাসপাতাল, নেই উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা—তাই ব্যথায় কাতর নারীকে কীভাবে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হবে, সেটিই হয়ে ওঠে পরিবারের প্রথম চিন্তা।
তজুমদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা ভোলা সদর হাসপাতালে যেতে নদীপথে ভরসা করতে হয় খেয়া ট্রলারের ওপর। সময়মতো খেয়া না মিললে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা দিয়ে রিজার্ভ করতে হয় ট্রলার। টাকার সংকট কিংবা ট্রলার পেতে দেরি হলে প্রসূতিকে নিয়ে পরিবারের সেই উৎকণ্ঠা গড়ায় জীবন-মরণের শঙ্কায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত রোগী হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সরকারিভাবে দেওয়া হয়েছিল নৌ অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু প্রায় ছয় বছর আগে বরাদ্দ দেওয়া সেই নৌ অ্যাম্বুলেন্স এখন পড়ে আছে একটি খালের পাশে। বছরের পর বছর ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হয়ে গেছে এর ইঞ্জিন, ভেতরে জমেছে কাদা-ময়লা, ভেঙে গেছে জানালার কাচ। ফলে যে নৌযানটি দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের জরুরি চিকিৎসার ভরসা হওয়ার কথা ছিল, সেটিই এখন পড়ে আছে অচল অবস্থায়।
প্রসবব্যথা উঠলেই শুরু হয় দুশ্চিন্তা
তজুমদ্দিন উপজেলার চর জহিরউদ্দিনে বসবাস করেন প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার মানুষ। অধিকাংশই দরিদ্র। পুরো চরে কোনো হাসপাতাল নেই। কয়েকটি ফার্মেসি থাকলেও সেখানে মেলে কেবল সাধারণ কিছু ওষুধ।
স্থানীয় বাসিন্দা বিলকিস বেগম বলেন, চরে কোনো নারীর প্রসবব্যথা উঠলে তাকে তজুমদ্দিন কিংবা ভোলা সদরের হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। এজন্য ভাড়া করতে হয় ট্রলার। অনেক সময় টাকা জোগাড় করতে দেরি হয়, আবার কখনো সময়মতো ট্রলারও পাওয়া যায় না। এতে রোগীকে নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়।
চিকিৎসা বঞ্চিত চরের মানুষের দুঃখগাথা
তার ভাষ্য, নদীপথে হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও অনেকটা সময় লাগে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো প্রসূতি নারী পথে, এমনকি বাড়ি বা চর থেকে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
চরবাসীর ভাষ্য, নিয়মিত খেয়া বা ট্রলারে করে কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নিতে হয়। তবে নির্দিষ্ট সময়ের ট্রলার মিস হলে অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকে না। জরুরি রোগী হলে বাধ্য হয়ে রিজার্ভ ট্রলার নিতে হয়। এজন্য খরচ পড়ে প্রায় ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা। অনেক দরিদ্র পরিবারকে এ টাকা ধার করে জোগাড় করতে হয়।
খেয়া ট্রলারই একমাত্র ভরসা
চর জহিরউদ্দিনের বাসিন্দা বিউটি বেগম ও আরজু আক্তার জানান, সরকারি নৌ অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার কথা তারা শুনেছেন। কিন্তু সেটি দিয়ে কোনো রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে—এমন দৃশ্য তারা দেখেননি।
একই চিত্র তজুমদ্দিনের চর মোজাম্মেলেও। চাঁদপুর ইউনিয়নের এই চরে বসবাস করেন প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ। এখানেও নেই কোনো হাসপাতাল বা উন্নত চিকিৎসাসেবা। দিনে দুবার খেয়া ট্রলার চলাচল করে। নির্ধারিত সময়ের ট্রলার চলে গেলে অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ থাকে না।
চর মোজাম্মেলের বাসিন্দা নাজমা বেগম ও মিরাজ উদ্দিন জানান, জরুরি রোগী হলে রিজার্ভ ট্রলার ছাড়া উপায় থাকে না। এতে খরচ হয় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা। নদীপথে তজুমদ্দিনে যেতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা।
চরে অসুস্থতা মানেই অনিশ্চয়তা, চিকিৎসা মানেই যুদ্ধ
তাদের মতে, নৌ অ্যাম্বুলেন্স চালু থাকলে অনেক কম সময়ে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হতো। তাদের ধারণা, নৌ অ্যাম্বুলেন্সে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিটে হাসপাতালে পৌঁছানো যেত।
৩০ লাখ টাকার নৌ অ্যাম্বুলেন্স পড়ে আছে খালে
চরাঞ্চলের মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার প্রকল্পের আওতায় তজুমদ্দিনে একটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ১৬ জানুয়ারি সেটি হস্তান্তর করা হয়। নৌ অ্যাম্বুলেন্সটির বরাদ্দমূল্য ছিল ৩০ লাখ টাকা।
কিন্তু বর্তমানে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি তজুমদ্দিনের মেঘনা নদীর পাশের একটি স্লুইসঘাটসংলগ্ন বন্ধ খালে রশি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ব্যবহৃত না হওয়ায় নৌযানটির বিভিন্ন অংশে মরিচা ও শ্যাওলা জমেছে। ভেতরে কাদা ও ময়লা জমে আছে। ভেঙে গেছে জানালার কাচ। নষ্ট হয়ে গেছে ইঞ্জিনও।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, যে নৌ অ্যাম্বুলেন্স দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবার জন্য দেওয়া হয়েছিল, সেটি চালু না থাকায় এর কোনো সুফল পাচ্ছেন না তারা।
চর জহিরউদ্দিনের বাসিন্দা বিউটি বেগম জানান, তারা শুনেছেন চরের মানুষের জন্য নৌ অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো রোগীকে ওই নৌ অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে—এমনটা তিনি দেখেননি।
প্রকল্প শেষ, নেই জ্বালানির বরাদ্দ
ভোলা সিভিল সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম জানান, নৌ অ্যাম্বুলেন্সটি কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার প্রকল্পের আওতায় দেওয়া হয়েছিল। প্রকল্পটি কয়েক বছর আগে শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটির জন্য জ্বালানি বরাদ্দ নেই।
তিনি জানান, প্রকল্প চলাকালেও নৌ অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনার জন্য কোনো চালক দেওয়া হয়নি। ফলে তখনও এটি নিয়মিতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে নৌ অ্যাম্বুলেন্সটির যন্ত্রাংশ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এটি মেরামত করে চালু করাও কঠিন বলে জানান সিভিল সার্জন।
ডা. মনিরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তজুমদ্দিনের জন্য নতুন একটি আধুনিক নৌ অ্যাম্বুলেন্স দেওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে। সেটি চালু হলে দুর্গম চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের জরুরি চিকিৎসাসেবা পেতে ভোগান্তি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এইচকেআর