ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম
  • জাসদ কার্যালয় থেকে সাংবাদিক নেতা আবু জাফর সূর্য আটক সাংবাদিক বেলায়েত বাবলু হাসপাতালে ভর্তি বরিশালে ১ হাজার পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক   আত্মঘা/তী সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির পথে পা বাড়িয়েছিলাম আমিও..... বরিশালে সাড়ে চার কেজি গাঁজাসহ মাদকবিক্রেতা গ্রেপ্তার বরিশালে নাশকতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে গোপন বৈঠক থেকে আটক ১২ জাসদ কার্যালয়ে গোপন বৈঠক, আ' লীগ সন্দেহে অর্ধশতাধিক আটক মিয়ারচরবাসীকে নদীভাঙন থেকে সর্বোচ্চ সুরক্ষা দেওয়া হবে: জহির উদ্দিন স্বপন ১৪ বছর আত্মগোপনেও শেষ রক্ষা হয়নি, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত লোকমান গ্রেফতার চুরির অভিযোগে খুঁটিতে বাঁধা বাবা, রুটি-চা নিয়ে ছুটে এলো শিশুকন্যা
  • আত্মঘা/তী সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির পথে পা বাড়িয়েছিলাম আমিও.....

    আত্মঘা/তী সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির পথে পা বাড়িয়েছিলাম আমিও.....
    ( ছবিটি সেই রাতের, ২০১২ সালের। যে রাতে বরিশাল থেকে পুলক দা আর আমি সম্পাদক গোলাম সরোয়ার ভাইয়ের বাড়ি গিয়েছিলাম, মটোর সাইকেল চালিয়ে। রাত ১২টায় ফেরার সময় বৃষ্টিতে ভিজেই ফিরি। পথে একটি দোকানে থেমে মাথা বাঁচাতে দু'জনে পিলিথিন ব্যাগ টুপির মতো করে পড়ি।)
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    "আমার দেশ ও নয়া দিগন্ত পত্রিকার আলোচিত সাংবাদিক মাসুম মিজান। নিশ্চয়ই সে ওমুক রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী। কাজ যতো ভালো করুক অথবা যতো মেধাবী রিপোর্টারই হোক, তাকে চাকরি দেওয়া যাবে না। তাহলে ইমেজ সংকটে পড়বে খোদ প্রতিষ্ঠান। আর উল্টা পাল্টা নিউজ করে পারপাস সার্ভ করে দিলে তো সর্বনাশ।"

    ২০১০ সালে এমন মিথ্যা ট্যাগের কবলে পড়ে ৫ মাস বেকার ছিলাম আমি। সন্দেহ, অবিশ্বাস ও মনগড়া গল্প জুড়ে দিয়ে আমাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কোর সদস্য বানানো হয়। বিশেষ করে সে সময়ের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন তালিকায় সরকার বিরোধী সাংবাদিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় আমার নাম। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে সমকাল পত্রিকায় কিভাবে আমি চাকরি পেয়েছিলাম? তখন তা সবার কাছে ছিলো বিস্ময়কর। 

    আমার সেই বেঁচে থাকার লড়াইগুলো ভীষণ মনে পড়ছে বরিশালের সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির আত্মহননের পর থেকে। আমিও ২০১১ সালে একবার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম, পা বাড়িয়েছিলাম পুলক চ্যাটার্জির পথে। এমন মূহুর্ত এসেছিল যে তখন দুটি সন্তানের মুখ মনে ভেসে না উঠলে হয়তো আজ আমারও বেঁচে থাকার কথা ছিল না। মহান আল্লাহ আমাকে হেফাজত করেছেন। 

    একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে ঢাকায় টিকে থাকার যুদ্ধে আমি যখন চরম বিপর্যয়ের মুখে। আত্মবিশ্বাস ও মনোবল পৌঁছে যায় তলানীতে। নিজের দুই সন্তানসহ বাবামায়ের সংসারে যখন ব্যর্থ মানুষ আমি। তখন সমকালে আমার চাকরিটা হতে যাদের অবদান, তারমধ্যে অন্যতম একজন হলেন পুলক চ্যাটার্জি। বরিশালে সাংবাদিকতার শুরুতে তিনি ছিলেন আমার একজন শিক্ষাগুরু। সেই অজস্র স্মৃতিগুলো ক'দিন ধরে ঘুরেফিরে সামনে আসছে। দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে ভেতরটা। 

    ২০১১ সাল। দুই মাস হয়েছে নয়া দিগন্ত ছেড়েছি। একদিন ইত্তেফাকের ক্রাইম রিপোর্টার জামিউল হাসান সিপু আমাকে কল দেন। তিনি সমকালের তৎকালীন ক্রাইম চীফ পিনাকী দাসগুপ্ত দাদার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তখন পিনাকী দাদাকে কল দিলে তিনি সমকালে চাকরির জন্য আমাকে একটি সিভি দিতে বলেন। সমকাল সম্পাদক মরহুম গোলাম সারোয়ার ভাই পিনাকি দা'কে মাঠের একজন ভালো ক্রাইম রিপোর্টার খুঁজে আনতে বলেছিলেন। কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক সহকর্মীর পরামর্শে পিনাকি দা যোগ্যতা বিচারে আমাকে গুরুত্ব দিলেন। 

    সাক্ষাৎ হলো গোলাম সারোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে। চাকরি প্রায় নিশ্চিত। তবে নিয়োগপত্র হয় হয় বলে আর হয় না। তৎকালীন নিউজ ম্যানেজমেন্টের প্রভাবশালী একটি অংশ আমার নিয়োগ প্রক্রিয়াটি আটকে দেন। অভিযোগ, আমি ওমুক/তমুক রাজনৈতিক পন্থী। আরো কতো কি! এতে গোলাম সারোয়ার ভাই ও পিনাকী দাদা বিব্রত হন। এমন পরিস্থিতিতে একদিন সমকালে চাকরির খবর নিতে গিয়ে দেখা হয় সিনিয়র ফটো সাংবাদিক কাজল হাজরা দাদার সঙ্গে। তিনি আমার আদ্যপান্ত অতীত সব জানতেন। সমকালে চাকরির চেষ্টা করছি শুনে তিনি গোলাম সারওয়ার ভাইকে আমার বিষয়ে জোড়ালো ভাবে বলার দায়িত্ব নেন। সমকালের চীফ ফটো সাংবাদিক নবীন হোসেন ভাইও আমার জন্য বলেন। এভাবে আমার তদবিরের পাল্লা ভারি হতে থাকে। তবুও চাকরিটা হচ্ছিল না। 

    আমিও নাছোড়বান্দা। ঠিক করি সমকালেই আমি চাকরি করবো সব মিথ্যার জবাব দিয়ে। দ্বিতীয় সারির একাধিক পত্রিকায় যোগদানের সুজোগ থাকলেও করিনি। পরিবার থেকে অন্য পেশায় নিশ্চিত চাকরির প্রকট চাপ উপেক্ষা করেছি। এভাবে অভিশপ্ত বেকারত্ব ৫ মাসে গিয়ে দাঁড়ায়। পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত বিপর্যয়ের মুখে দিশেহারা। সেই সময়ে পুলক চ্যাটার্জির জোড়ালো সুপারিশে শেষ পর্যন্ত সমকালে আমাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন সম্পাদক গোলাম সারোয়ার ভাই। সমকাল বরিশালের তৎকালীন ফটো সাংবাদিক কাজী মিরাজ ভাইও সেই যুদ্ধে আমার পাশে ছিলেন। 

    কিন্তু সমকালে যোগদানের পর আমি বুঝতে পারি যে কতো বড় ভুল আমি করেছি। নিউজ যা লিখে জমা দেই, তা কিচ্ছুই হয় না আমার। মিড নিউজ ম্যানেজমেন্টে ধামাচাপা পড়ে যায় আমার অসংখ্য বিশেষ প্রতিবেদন। ৫ মাস জমে থাকা কাজের ক্ষুধায় আমি আরো বেগবান হয়ে উঠেছিলাম। অথচ প্রথম মাসেই আমার ১৪টি বিশেষ রিপোর্ট প্রায় কিল হয়ে যায়। সেই প্রতিবেদনগুলো ছিলো আমার এক একটি সন্তানের মতো। দেশ, মানুষ ও সমাজের কল্যাণে উদ্ভাবনী প্রতিবেদন। আমার ইবাদত। কঠিন অমানবিক এক পরিস্থিতির মুখে পড়ি।

    সন্ধ্যায় গোলাম সরওয়ার ভাই যখন ভরা নিউজ রুমে বসতেন, তখন আমার কোনো নিউজ তার হাতে পৌঁছাতো না। বরং একটি পর্যায় থেকে নিউজ নিয়ে চেচামেচি করা হতো, কি লিখে এনেছি আমি এমন ধমকও খেতাম। যা দেখে সরোয়ার ভাই আমার উপর বিরক্ত হতেন। এভাবে শুরু থেকেই সারোয়ার ভাইয়ের কাছ থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। তাঁকে নানা কায়দায় বোঝানো হয় আমি কিছুই পারি না, আনস্মার্ট। কৌশলে কেড়ে নেওয়া হয় আমার কাজের আনন্দ, ছন্দ আর আত্মবিশ্বাস।  

    অথচ সমকালের আগে পাঁচ মাস বেকারত্বের যন্ত্রণা ও সীমাহীন অনিশ্চয়তা আমাকে দমাতে পারেনি। বহুমুখী চাপেও নত হইনি। ততোদিনে আমি বুঝে গিয়েছিলাম সাংবাদিকতা আমার কাছে পেশার চাইতেও বড় কিছু, মুল্যবান ইবাদত। তাই সুযোগ থাকা সত্বেও শত পারিবারিক চাপেও অন্য কোনো পেশায় আমাকে নেওয়া সম্ভব হয়নি। সেই মনোবল আমার প্রথম ভাংতে শুরু করে সমকালে যোগ দিয়ে। 

    রাজধানীতে গু/লি করে মোটর সাইকেল ছিনতাইয়ের একটি নিউজ লিখে জমা দিয়েছিলাম একদিন। সন্ধ্যার পর ভরা নিউজ রুমে গোলাম সারোয়ার ভাইয়ের উপস্থিতিতে সেই নিউজ নিয়ে আমার ডাক পড়ে। একজন কর্তাব্যক্তি নিউজটি আমার দিকে ছুড়ে মেরে চিৎকার করে বলেন, তোমার লেখা কিছুই হয় না। একজন সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টারের লেখা এতো বাজে হয় কিভাবে? হাউজ ভর্তি সহকর্মীদের সামনে সেদিনের এই আচরণ হঠাৎ আমাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আত্মবিশ্বাস বা মনোবল শূন্য হয়ে যায়।  

    লজ্জা অপমানে সেই রাতের একপর্যায়ে আমার মনে হয় বেঁচে থেকে আর লাভ নেই। চরম বাজে চিন্তা এসে ভর করে মাথায়। সেই মুহূর্তে হঠাৎ মনে ভেসে ওঠে বাচ্চা দুইটার মুখ। আমি না থাকলে ওদের কি হবে? এই প্রশ্নে আটকে যায় সেই আত্মহননের মতো মহাপাপের চিন্তা। এরপর হজম করতে শিখি অনেক কিছু। তবে যে দুই বছর সমকালে ছিলাম মন খুলে আর কাজ করতে পারিনি। কতিপয় প্রভাবশালীর বাধা সত্বেও সমকালে যোগ দিয়ে আমি হারে হারে টের পেয়েছিলাম, ইন হাউস মিডিয়া পলিটিক্স কতটা ভয়ানক হতে পারে। এতে কিভাবে অসংখ্য মেধাবী সাংবাদিক ঝরে পড়ে?

    সমকালে চাকরির মাঝামাঝি ২০১২ সালের শেষদিকে রিজাইন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। ভেতরে ভেতরে অন্য একটি পত্রিকায় চাকরি নিশ্চিত হয়। এর আগে ছুটিতে বরিশাল যাই। সুখদুঃখের কথা বলতে দেখা করি পুলক দাদা সঙ্গে। তিনি আমাকে সমকালের চাকরি ছাড়তে নিষেধ করেন। তার কাছে জানতে পারি সেদিন সম্পাদক গোলাম সারোয়ার ভাই তার বানারীপাড়ার বাড়িতে এসেছেন। পুলক দাদা সন্ধ্যার পর আমাকে নিয়ে বরিশাল থেকে সারোয়ার ভাইয়ের বানারীপাড়ার বাড়ি গেলেন। সারোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে আমাকে সামনে রেখে কিছু কথা বলেছিলেন। যার কিছুটা সুফল পরে ঢাকায় এসে আমি পেয়েছিলাম। 

    হয়তো আমার এই কথাগুলো কখনোই বলা হতো না। একজন পুলক চ্যাটার্জির মতো সফল ও সিনিয়র সাংবাদিক কেনো অবুঝ হয়ে দুনিয়া ছাড়লেন? নিজের জীবনের ভার এতটা কষ্টের কেনো মনে হলো তার কাছে? তা ভাবতে গিয়েই আমার কিছু কষ্টের অতীত বলে ফেললাম। কারো বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা নিয়ে অথবা কাউকে আঘাত করার জন্য নয়। অতীত নিয়ে কারো প্রতি আমার কোনো কষ্ট নেই। আল্লাহ উত্তম ফয়সালাকারী। যা তিনি ধার্য্য করেছেন সেটাই আমি ভোগা করেছি। আলহামদুলিল্লাহ।  

    তারপরও সমকালে আমার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো- যারা আমাকে ব্যর্থ বানাতে চেয়েছিলেন তারা শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছিলেন কে আমি? বিদায়বেলায় তারাই আবার আটকাতে চেয়েছিলেন। কারো চোখে জলও এসেছিলো আমার জন্য। তারা কেউই আজ সমকালে নেই।  

    দায়িত্বশীল পদে থাকা কিছু অযোগ্য ব্যক্তির কারণে অনেক ক্ষতি হয়ে যায় প্রতিষ্ঠানের, যা মালিক পক্ষ বা শীর্ষ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরাও বুঝতে পারেন না। দোষ কোনো প্রতিষ্ঠানের হতে পারে না, দোষ কতিপয় অসাধু ব্যক্তির। 
     -

    (সাংবাদিক মাসুম মিজানের ফেসবুক থেকে নেওয়া)

     


    এইচকেআর
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ