১৬১ দেশ পেরিয়ে পিরামিডের দেশে কাজী আসমা

বুকে লাল-সবুজের পতাকা আর হাতে একটি সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে বিশ্বজুড়ে ডানা মেলে উড়ে চলেছেন বাংলাদেশের সুপরিচিত ভ্রমণকন্যা কাজী আসমা আজমেরী।
এখন পর্যন্ত বিশ্বের ১৬১টি দেশের সীমানা পেরিয়ে, নানা সংস্কৃতি ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি সম্প্রতি পা রেখেছিলেন ইতিহাস আর প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিশরে। কিন্তু নীল নদ আর পিরামিডের দেশে প্রবেশের এই গল্পটি অন্যসব দেশের মতো সহজ ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল দীর্ঘ অপেক্ষা, গভীর জিজ্ঞাসা আর তীব্র অনিশ্চয়তায় ভরা এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
ভ্রমণের ধারাবাহিকতায় আসমা আজমেরী আলজেরিয়া থেকে বিমানে পৌঁছান কায়রো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বিমানবন্দরে নেমেই নিয়মানুযায়ী ব্যাংক বুথ থেকে অন-অ্যারাইভাল স্টিকার ভিসাও সংগ্রহ করেন। কিন্তু মূল জটিলতা তৈরি হয় ইমিগ্রেশন ডেস্কে। কর্তব্যরত কর্মকর্তার হাতে বাংলাদেশি পাসপোর্টটি যাওয়া মাত্রই তার চোখেমুখে ফুটে ওঠে অতিরিক্ত সতর্কতার ছাপ। পাসপোর্টটি জমা রেখে আসমাকে অপেক্ষা করতে বলে পাঠিয়ে দেওয়া হয় উচ্চপর্যায়ের যাচাই-বাছাইয়ের জন্য।
শুরু হয় এক অন্তহীন প্রতীক্ষা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, কিন্তু ইমিগ্রেশনের সেই রুদ্ধদ্বার কক্ষ থেকে কোনো বার্তা আসে না। একজন প্রকৃত পর্যটকের জন্য এই ধরনের পরিস্থিতি কতটা মানসিক চাপের, তা কেবল একজন ট্রাভেলারই বোঝেন।
পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন না দেখে আসমা আজমেরী নিজেই উদ্যোগী হন। তিনি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের মুখোমুখি হয়ে নিজের ভ্রমণের আসল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন। তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, কোনো অবৈধ কাজের জন্য নয়, বরং কেবলই একজন প্রকৃত পর্যটক এবং বিশ্বভ্রমণকারী হিসেবে তিনি মিশরের ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখতে এসেছেন।
আসমা আজমেরী বলেন, আমার বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকলেও আমার কাছে ছিল যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের অত্যন্ত শক্তিশালী ও বৈধ ভিসা। তারপরও শুধু বাংলাদেশি পাসপোর্টের কারণে আমাকে সেখানে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
নিজের সততা ও পর্যটক পরিচয় প্রমাণ করতে তিনি একে একে তার পূর্ববর্তী ১৬০টি দেশ ভ্রমণের ইতিহাস, ব্যাংকের স্টেটমেন্ট এবং আকর্ষণীয় সব নথিপত্র প্রদর্শন করেন। তিনি কর্মকর্তাদের কাছে অনুরোধ জানান, অন্তত দুই দিনের জন্য হলেও যেন তাকে কায়রো শহরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
দীর্ঘ সাত ঘণ্টার এক রুদ্ধশ্বাস আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণের পর অবশেষে মিশরীয় কর্তৃপক্ষ তার নথিপত্রের সত্যতা স্বীকার করে এবং তাকে নীল নদের দেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়।
মিশরের মাটিতে পা রাখতে পারলেও আসমা আজমেরীর এই অভিজ্ঞতা এক বড় প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। কায়রো বিমানবন্দরে এটি এখন আর কোনো একক ঘটনা নয়; বৈধ ভিসা ও বিদেশি রেসিডেন্স কার্ড থাকার পরও অসংখ্য বাংলাদেশি প্রতিদিন সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছেন। ব্যবসায়ী, সমাজকর্মী থেকে শুরু করে পরিবারসহ ঘুরতে যাওয়া মানুষও এই অতিরিক্ত কড়াকড়ির শিকার হচ্ছেন।
জানা যায়, কিছু অসাধু চক্রের কারণে আন্তর্জাতিক মহলে আজ বাংলাদেশের এই সবুজ পাসপোর্টের ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া স্কলারশিপ লেটার তৈরি, অবৈধ ডলার লেনদেন এবং মিশরকে ট্রানজিট বানিয়ে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে মানবপাচারের মতো গুরুতর অপরাধের খেসারত দিতে হচ্ছে আসমা আজমেরীর মতো প্রকৃত দেশপ্রেমিক ভ্রমণকারীদের।
এইচকেআর