ঢাকা সোমবার, ০১ জুন ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম
  • গৌরনদীতে বাস-পিকআপের সংঘর্ষে আহত ১৪ একসময়ের প্রতিষ্ঠিত চামড়া ব্যবসায়ী এখন আড়তের শ্রমিক বরিশালে ঈদের ছুটিতে ৬ হত্যাসহ ১৮ জনের প্রাণহানি মঠবাড়িয়ায় বৃদ্ধের লাশ হাসপাতালে রেখে পালিয়েছে স্বজনরা সামনে কঠিন সময় অপেক্ষা করছে, হেসেখেলে চলে গেলে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে মঠবাড়িয়ায় এক ইউনিয়নে দুইজন খুন, ব্যবসায়ী নিখোঁজ কলাপাড়ায় বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে কিশোরকে ডেকে নিয়ে হত্যা, আটক ৩ বিসিসির সাবেক জনপ্রিয় কাউন্সিলর সৈয়দ জাকির হোসেন জেলালের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত কোরবানির পশুর হাটে মহিষের গুঁতায় দুই ক্রেতা নিহত দাঁতের যন্ত্রণায় ছটফট করছেন নেতানিয়াহু, নেয়া হলো হাসপাতালে
  • একসময়ের প্রতিষ্ঠিত চামড়া ব্যবসায়ী এখন আড়তের শ্রমিক

    একসময়ের প্রতিষ্ঠিত চামড়া ব্যবসায়ী এখন আড়তের শ্রমিক
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    বরিশাল নগরীর একসময়ের প্রতিষ্ঠিত চামড়া ব্যবসায়ী মো. আল আমিন মিয়া। প্রতি বছর কোরবানিতে এ অঞ্চল থেকে লাখ লাখ টাকার চামড়া কিনে পাঠাতেন ঢাকার ট্যানারিতে। দেনায় ডুবে সেই আল আমিন মিয়া এখন অন্য চামড়ার আড়তের দিনমজুর। দৈনিক মজুরিতে যা আয় তা দিয়ে টেনেটুনে চলে তার সংসার।

    আল আমিনের মত আরও অনেকেই চামড়া ব্যবসায় সর্বস্ব পুঁজি খাটিয়ে এখন নি.শ্ব। বিভাগজুড়ে একসময় যেখানে ৩২ জন চামড়ার আড়তদার ছিলেন সেখানে এবার ঈদে মাত্র দু’জন কোরবানির পশুর চামড়া ব্যবসায় পুঁজি খাটিয়েছেন।

    ধার দেনা করে চামড়া কিনে তারাও এখন আছেন চরম হতাশা আর অনিশ্চয়তায়। লাখ লাখ টাকা দেনার মধ্যেই নতুন করে চামড়ার সরকার নির্ধারিত মূল্য পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত তারা। এ বিষয়ে সরকার প্রধানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

    রোববার (৩১ মে) বরিশাল নগরীর হাটখোলার আড়তদার মো. বাচ্চু মিয়ার আড়তে গিয়ে দেখা যায়, কোরবানির তিনদিনে বরিশালের বিভিন্ন জনপদ থেকে সংগ্রহ করা চামড়া লবনজাতকরণে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ছয়জন শ্রমিক। কেউ চামড়া এক স্থান হতে অন্য স্থানে স্তুপ করছেন, আবার কেউ চামড়ায় লবন ছেঁটানোর কাজে ব্যস্ত।

    তাদেরই মধ্যে একজন আল আমিন মিয়া। যিনি একসময় নগরীতে চামড়ার ব্যবসা করতেন। লাখ লাখ টাকা পুঁজি খাটিয়েছেন এই চামড়া ব্যবসায়। অথচ দেনায় ডুবে গত পাঁচ বছর ধরে তিনি অন্যের চামড়ার আড়তে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। আলাপকালে আল আমিন মিয়া ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, বরিশাল চামড়ার ব্যবসা শেষ। মহাজনরা কোটি কোটি টাকা দেনা করে এখন নি.শ্ব। ট্যানারি মালিকরা বছরের পর বছর তাদের পুরানো পাওনা টাকা পরিশোধ করছে না।

    তিনি বলেন, একসময় আমার ভাই চামড়া ব্যবসা করতো, আমি নিজেও ব্যবসা করতাম। কিন্তু লক্ষ লক্ষ টাকা আটকে আছে ট্যানারি মালিকদের কাছে। তারা দেনা পরিশোধ করছে না। আজ দেব, কাল দেব বলে শুধু সময়ক্ষেপণ করছে। আমি একাই প্রায় ৩০ লাখ টাকা পাওনা আছি। সেটা না পেয়ে “আগে আমার ব্যবসা থাকলেও এখন আমি বদলা দেই”।

    আল আমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার প্রতি বছর এসে শুধু লোভই দেখায়। কিন্তু আমাদের পাওনা পরিশোধের কোন উদ্যোগ নেয় না। সরকার এতো কিছুর উদ্যোগ নেয় কিন্তু বরিশালে একটা ট্যানারি কারাখানা দিতে পারে না ! বরিশালে চামড়ার শিল্প কারখানা চালু করা হলে ঢাকার ট্যানারি মালিকরা সোজা হয়ে যায়।

    বরিশাল বিভাগীয় চামড়া ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বাচ্চু মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘চামড়া ব্যবসা নিয়ে এখন আর কিছু বলতে ইচ্ছে হয় না। প্রতি বছর কোরবানি এলেই সরকার চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়, প্রশাসন ডেকে বিভিন্ন দিক-নির্দেশনা দেয় কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয় না। আমরা ব্যবসায়ীরা অসহায় অসহায়ই থেকে যাচ্ছি।

    বাচ্চু মিয়া বলেন, একসময় আমরা বরিশাল বিভাগে আমাদের সংগঠনের অধিনে ৩৬ জন ব্যবসায়ী ছিল। এখন বরিশাল শহরে আমরা দু’জন মাত্র ব্যবসা করছি। আমি এবং আমার সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাহমুদ শাহিন। বাকিরা কেউ দেনা নিয়ে মারাগেছে, আবার বেশিরভাগ ব্যবসায়ী তাদের পেশা পরিবর্তন করে নিয়েছে। বরিশালে প্রায় ৪০ বছরের পুরানো চামড়া ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে আমরা দু’জন এবারও ধার দেনা করে চামড়া ব্যবসায় পুঁজি খাটিয়েছি।

    বাচ্চু মিয়া আরও বলেন, পূর্বে প্রতি বছর ১০-১৫ হাজার পিস চামড়া কিনতাম। তখন একপিস গরুর চামড়া সাড়ে ৩ হাজার টাকায় কিনেছি। এখন সেই চামড়া ৩০০ টাকায় কিনতেও ভয় লাগে। ছাগলের চামড়াতো ফ্রিতে দিলেও নেই। এবার ঈদে সকালের দিকে প্রতি পিস কাঁচা চামড়ার মূল্য ৬২৫ টাকা পর্যন্ত দিয়েছি। বিকেলের পরে সেই একই চামড়া ৫০০-৪০০ টাকায় কিনেছি। এবার সর্বোচ্চ প্রায় পাঁচ হাজার পিস চামড়া কিনতে পেরেছি। তাও বেশিরভাগ চামড়া বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে বাকিতে কিনেছি। তাদের সাথে চুক্তি হয়েছে চামড়া বিক্রি করতে পারলে তারা টাকা পাবে।

    আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে লবন, শ্রমিকের টাকা পরিশোধ করছি। ঈদের দিন থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিদিন ৫০ জনের মত শ্রমিক কাজ করছে। এখন দাম না পেলে লবন, শ্রমিকের টাকা, নগদপূজি সবই হারাতে হবে। নতুন করে আবার লোকসান গুণতে হবে। তাছাড়া আমরা কখনই সরকারি দরে চামড়া বিক্রি করতে পারি না। এবার সরকারিভাবে প্রতি বর্গফুট চামড়ার মূল্য ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দামে ট্যানারি মালিকরা চামড়া কিনতে রাজি না। সরকার নির্ধারিত দাম চাইলে বলে “সরকারের কাছে” বিক্রি করতে।

    তিনি বলেন, মূলত লবনের মূল্য বৃদ্ধি। একসময় যেই লবন ৬শ টাকায় কিনেছি এখন তা কিনতে আড়ত পর্যন্ত পৌঁছাতে ১১শ টাকা লেগে যাচ্ছে। সরকার মাদ্রাসাগুলোতে লবন দেয়। অথচ এই লবনটা আমাদের ব্যবসায়ীদের দিলে কাজে লাগতো। অন্তত অর্ধেক দামেও যদিও লবন দিতে তাতেও আমারা উপকৃত হতাম। তার ওপর ট্যানারি মালিকদের কাছে ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা পাওনা। 

    ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত আমি ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে দেড় কোটি টাকা পাবো। এই দেনা মেটাতে নিজের একটি আবাসিক হোটেল এবং একটি বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছি। এর পরও ট্যানারি মালিকদের কাছে বছরের পর বছর ধর্ণা দিয়েও পাওনা টাকা আদায় করতে পারিনি। আদৌ পাবো কিনা তার কোন নিশ্চয়তা নেই। আর সরকারও এ বিষয়ে কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না।

    বাচ্চু মিয়া বলেন, বিশ্ব বাজারে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না। বাংলাদেশ থেকে শুরু চিন চামড়া নিচ্ছে। আর পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে ইউরোপের দেশগুলোতে চামড়া রপ্তানি করছে। অথচ ভারতের চেয়ে গুণে মানে বাংলাদেশের চমড়া সর্বত্তম। 

    এরপরও বাংলাদেশের পশুর চামড়া ফেলে দিতে হয় কিনা চাহিদা নেই। সরকারের উচ্চ এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া। না হলে এসময় বাংলাদেশ থেকে চামড়া শিল্পই হারিয়ে যাবে।
     


    এইচকেআর
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ