মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
ইনুর বিরুদ্ধে তিনটি অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ১০ বছর করে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তাকে একসঙ্গে ১০ বছর সাজা খাটতে হবে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) দুপুরে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায় ঘোষণা উপলক্ষে পৌনে ২টার দিকে হাজতখানা থেকে ইনুকে এজলাসে তোলা হয়। ২টার কয়েক মিনিট আগে রায় পড়া শুরু করেন আদালত।
এজলাসে তোলার সময় ইনু পুলিশকে তার হাত ধরতে নিষেধ করেন। তিনি সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি ও কফি কালারের জুতা পরিহিত অবস্থায় আসামির কাঠগড়ায় চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসে রায় পড়া শোনেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণার জন্য গত ২২ জুন আজকের এই দিন নির্ধারণ করেন। এর আগে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ১৪ মে আদালত মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। ওইদিন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও ফারুক আহাম্মদ। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী ও সিফাত মাহমুদ।
প্রসিকিউশন আদালতে দাবি করেছিলেন, ইনুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে এবং তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উচিত। অন্যদিকে আসামিপক্ষ বলছিল, অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং তারা ইনুর খালাস চান।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উসকানি ও প্ররোচনা দিয়েছিলেন জাসদ সভাপতি। তার প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত নেন ও বাস্তবায়ন করেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে সংঘটিত অপরাধের জন্য ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়ও তার ওপর বর্তায় বলে প্রসিকিউশন যুক্তি দেয়।
শুনানির সময় প্রসিকিউশন আদালতে শেখ হাসিনা ও ইনুর মধ্যে টেলিফোনে কথোপকথনের একটি রেকর্ড উপস্থাপন করে, যেখানে জাসদ সভাপতি গণআন্দোলনকে জঙ্গিবাদ আখ্যা দিয়ে দমনের কথা বলেন।
তবে আসামিপক্ষ দাবি করে, ওই কথোপকথনের কোথাও আন্দোলন দমনে গুলি চালানো, বোমাবর্ষণ করা বা নির্যাতনের নির্দেশ কিংবা তেমন কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য নেই। তাদের আরও দাবি, প্রসিকিউশনের দাখিল করা নথিতেও এমন কোনো তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি, যা থেকে প্রমাণিত হয় যে ইনু আন্দোলন দমনে গুলি বা নির্যাতনের নির্দেশ দিয়েছেন, উসকানি দিয়েছেন কিংবা কোনো ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছেন।
জাসদ সভাপতি ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট গ্রেফতার হন। পরে গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। মামলাটিতে গত ২৫ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগ দাখিল করে। সেদিন শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল ইনুর বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন। ১ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন ইনু। তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়ায় নিজের আসনে তিনি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।
এইচকেআর