তিন আসামির জবানবন্দিতে উঠে এলো অপ্রতিম হত্যার ভয়াবহ বর্ণনা

অপ্রতিমকে হত্যার পর এক আসামি বের হয় তাকে খুঁজতে, অন্য দুই আসামি দেয় শোকের পোস্ট। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক আবিদা সুলতানা মলির কাছে দেওয়া তিন আসামির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব বিষয় উঠে এসেছে।
জবানবন্দির পর পুলিশ কোনো কিছু না বললেও নাম প্রকাশ না করে কয়েকটি সূত্র বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে।
প্রধান আসামি তুহিন জানান, হত্যার পরদিন সকালে অপ্রতিমের মামা তাকে ফোন করে অপ্রতিমের খোঁজ নেন। এরপর তিনি সিয়ামকে নিয়ে কোটবাড়িতে অপ্রতিমের খোঁজ করতে যান। এছাড়া তার মরদেহ উদ্ধারের পর তুহিন ও সিয়াম শোক জানিয়ে ফেসবুকে পোস্টও করেন।
অপ্রতিমের বাবার দোকানে কর্মরত কিশোর ফাহাদ বলেন, পরদিন সে অপ্রতিমের বাবার একজন সহকারীর সঙ্গে অপ্রতিমকে খুঁজেছে। অপ্রতিমের মরদেহ পাওয়ার খবর শুনে সেও ঘটনাস্থলে যায়।
আসামিরা আরও জানায়, অপ্রতিম হত্যার পরিকল্পনা করা হয় ৭ দিন আগে। এনিয়ে বিস্তারিত কথোপকোথন হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে তাকে ডেকে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আদালত ও পুলিশের একটি সূত্র এসব তথ্য জানিয়েছেন।
জবানবন্দি দেওয়া আসামিরা হলেন- সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), ১৬ ও ১৫ বছর বয়সি দুই কিশোর এবং অপর আসামি সিয়াম (১৮)।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে তুহিন জানিয়েছেন পাঁচ-ছয় মাস ধরে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয়। সিয়ামের মোটরসাইকেলে করে ছবি তোলা ও টিকটক করার জন্য অপ্রতিম তাদের সঙ্গে বের হত। অপ্রতিমের আইফোনের ওপর লোভ ছিল তুহিন ও সিয়ামের।
আমার সন্তানকে ফার্মের মুরগির মতো বড় করতে চাইনি: অপ্রতিমের মা
তুহিনের দাবি, ঘটনার আগের শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের একটু সামনে দুজনের দেখা হয়। সেখানেই আইফোন নেওয়া এবং অপ্রতিমকে হত্যার পরিকল্পনা হয়।
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ১৬ বছর বয়সি কিশোর জানায়, আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে মারার প্ল্যান করে তুহিন।
তৃতীয় জবানবন্দিতে ১৫ বছর বয়সি কিশোর জানায়, ঘটনার দিন বিকেলে তার বন্ধুই তাকে পরিকল্পনার কথা জানায় যে তুহিনের সঙ্গে মিলে আইফোনের জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হবে।
১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনের দেখা হয়। অপ্রতিম তাকে নিজের টিকটক অ্যাকাউন্টের ঠিকানা দেয়। ওই রাতেই টিকটকে অপ্রতিমকে মেসেজ করেন তুহিন। পরে অপ্রতিম একটি মুঠোফোন নম্বর দিলে সেই নম্বরে কথা হয়। পরদিন জুমার নামাজের পর দেখা করার সিদ্ধান্ত হয় তাদের।
দেড় বছর আগে অপ্রতিমের মায়ের হাতে গাঁজাসহ আটক হয়েছিল ফাহাদ
১৬ বছর বয়সি কিশোরের বর্ণনা মতে, দুপুর দুইটার পর কোটবাড়ির বোর্ড মার্কেট এলাকায় তার সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। পরে সন্ধ্যার আগমুহূর্তে সে ১৫ বছর বয়সি কিশোরকে নিয়ে পাহাড়ে যায়। যাওয়ার আগেই ওই বন্ধুকে পরিকল্পনার কথা খুলে বলেন।
১৬ বছর বয়সি কিশোর আরও জানায়, সে অপ্রতিমের কাছে ফোন চাইলে অপ্রতিম সেটি তাকে দেয়। কিছুক্ষণ ব্যবহারের পর সে ফোনটি তুহিনের হাতে দেয়। এরপর ফোন নিয়ে অপ্রতিম ও তুহিনের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। এরপর তাকে মারধরের ঘটনা ঘটে। প্রথমে অপ্রতিমকে একটি থাপ্পড় মারেন তুহিন। এরপর পাশে পড়ে থাকা কোদালের হাতল নিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করা হয়। তারপর অন্য দুজনকে মারতে বলেন। সে আরও জানায় আমাদের প্ল্যান ছিল, তুহিন ওই মোবাইল ফোন বিক্রি করে ১৬ ও ১৫ বছর বয়সি দুই কিশোরকে টাকার ভাগ দিবে।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান জবানবন্দি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে তিনি আসামি সিয়ামের বিষয়ে বলেন, সিয়াম এখনো স্বীকারোক্তি দেয়নি। তার বিষয়ে তদন্ত চলছে। রিমান্ডের বিষয়টি আরও পরে জানা যাবে।
এইচকেআর