ঢাকা বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১

Motobad news

ঋণ পেলে ঘুরে দাঁড়াতে পারে নাজিরপুরের ভাসমান সবজি চাষীরা

ঋণ পেলে ঘুরে দাঁড়াতে পারে নাজিরপুরের ভাসমান সবজি চাষীরা

পিরোজপুর জেলার উত্তরে নাজিরপুর উপজেলার শেষের দিকের কিছু এলাকা প্রায় সারাবছরই জোয়ার ভাটার কারণে জলাবদ্ধতার মধ্যে থাকে। কচুরিপানা ভাসমান হওয়ায় এই অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে প্রায় বছরজুড়েই চলে শতবর্ষী ভাসমান সবজি চাষের মহোৎসব। 

কচুরিপানার ধাপ তৈরি হলেই সেসব ভাসমান বীজতলায় পেঁপে, লাউ, কুমড়া, শিম, বরবটি আবার অন্যগুলো টমেটো, বেগুন, করলা, চিচিঙ্গা, ঝিঙ্গা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, সবুজ ফুলকপি, শসার চারা উৎপাদন এবং লাউশাক, লালশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক বা সাদা শাকের চাষও করেন চাষীরা। 

সম্ভাবনাময় এই কৃষিক্ষেত্রে কোন সহযোগীতা না থাকার ফলে হতাশ চাষীরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরামর্শে অল্প পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহার করে ভালো ফল পাচ্ছেন। এদিকে কৃষকদের পাশে থেকে সার্বক্ষণিক তাদের সহযোগিতা ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর।

জানা যায়, শত বছরের বেশি সময় ধরে পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলায় ভাসমান পদ্ধতিতে উৎপাদন হচ্ছে বিভিন্ন জাতের সবজি ও চারা। এই এলাকায় উৎপাদিত সবজি দেশের সিংহভাগ চাহিদা পূরণ করছে। আর এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান হয়েছে বিলাঞ্চলের কয়েক হাজার চাষীদের। 

ভৌগোলিকভাবেই পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ী-দোবড়া, কলারদোয়ানিয়া ও মালিখালী এবং নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা সারা বছর ৫-৮ ফুট পানিতে নিমজ্জিত থাকে। ফলে সেখানে কোন প্রকার চাষাবাদ করা সম্ভব হয় না। রবি, খরিপ-১ ও খরিপ-২ মৌসুমে বিভিন্ন ফসল চাষাবাদে চাষীরা ব্যাংক থেকে সহজে  ঋণ সুবিধা না পাওয়ায় স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বহুমুখী এ ফসল আবাদ করেও বেশিরভাগ সময় লাভের মুখ দেখেন না। আবার এই সুদখোর মহাজনদের দাদন ব্যবসার জালে জড়িয়ে অনেক চাষী হারান সর্বস্ব। 

প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলহানি, পণ্যের মূল্যহ্রাস, বাজারজাত করণে অসুবিধা ও সংরক্ষণ সুবিধার অভাব ইত্যাদি কারণে চাষীরা প্রতি বছর কাংখিত লাভ পায় না বরং মোটা লোকসানের কবলে পড়ে। যার অধিকাংশ কৃষক ভূমিহীন ও বর্গাচাষী। এ পেশার সাথে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত কমপক্ষে ১৫ হাজার চাষী। তাই এ পেশায় সংশ্লিষ্টদের রক্ষায় প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা পাওয়া প্রত্যাশা স্থানীয় চাষীদের।

চাষী নজরুল ইসলাম জানান, নিজস্ব জমি খুবই কম যতটুকু আছে বেশিরভাগই বর্গা নেয়া জমি। এই জমিতেই গড়ে তোলা হয়েছে ভাসমান সবজির ক্ষেত। ভাসমান অবস্থায় তৈরি হয় বেড বা ধাপ। আমার নিজের চাষ করার মতো ১৫/১৬ টি ধাপ আছে। সিম, পেঁপে, টমেটো, মরিচ ও লাউসহ বিভিন্ন সবজির চাষ হয় এখানে। ৬০ হাত একটি বেড কিনে আনলে কৃষাণ খরচসহ ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয় প্রতি বেডে। করোণার কারণে ব্যাপারীদের আসা যাওয়া না থাকায় গতবছর দাম ভালোই ছিল কিন্তু এ বছর দাম ভালো পাচ্ছিনা।

চাষী সাব্বির হোসেন জানান, অতিরিক্ত বন্যার কারনে আমাদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে চারা পঁচে গলে যায়। ক্রেতারা বৃষ্টি বেশি থাকলে চারা কিনতে চায় না কারন তা রোপন করলে মারা যাওয়ার ভয় থাকে। আমাদের এখানে ট্রলার এবং নৌকা ছাড়া কোন কাজ করা যায় না। ট্রলার হলে সুবিধা হয় কিছুটা কিন্তু নৌকা হলে অসুবিধা বেশি থাকে। নৌকায় যাতায়াতে সময় বেশি লাগায় কৃষক ফসলের দাম সঠিকভাবে পায় না। আমরা চাষের জন্য স্বল্প সুদে দেয়া ব্যাংক থেকে ঋণ পেলে মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হত না।

চাষী মোঃ রিপন মোল্লা জানান, এই এলাকার প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ভাগ মানুষ ভাসমান সবজি চাষের সাথে জড়িত। বৈশাখ থেকে অগ্রহায়ন মাস পর্যন্ত এই ভাসমান সবজির চাষ চলে। পানি শুকিয়ে যাওয়ার পরে ভাসমান সবজি উঠে গেলে অন্যান্য অনেক ফসল চাষ হয় এখানে। ভাসমান এই সবজি ক্ষেতে বিভিন্ন প্রকার সবজির চাষ হয়। শ্রমিকদের এই কাজের জন্য প্রতিদিন ৫০০/৬০০ টাকা দেওয়া লাগে। বাজার দামের ভিত্তিতে আমাদের লাভ হয় যা গতবছরে চারা প্রতি ৮/৯ টাকা ছিল কিন্তু করোণার কারনে এ বছর কেউ ২ টাকায়ও কিনতে চায় না।

পাইকারী ব্যবসায়ী সালেক ব্যাপারী জানান, আমরা এই বৈঠাকাটা থেকে সবজি পাইকারী দাম ২০/২৫ টাকায় কিনে স্বরুপকাঠীসহ বিভিন্ন এলাকায় ৩০/৩৫ টাকায় বা বিভিন্ন দামে বিক্রি করি। সড়ক পথ ভালো হলে বড় ব্যাপারীও আসতে পারে ব্যবসা বাণিজ্য ভালো হয়।

পাইকারী ব্যবসায়ী মো: দেলোয়ার হোসেন জানান, ২০ বছর যাবত এই সবজি ব্যবসার সাথে জড়িত। এই বৈঠাকাটা বাজার থেকে সবজি কিনে আমি মঠবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করি। ঢাকা, পাথরঘাটা মহিপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এই মালামাল যায়। করোণার কারণে বর্তমানে অনেক অসুবিধায় আছি, সড়ক পথ যদি উন্নত হইত তাহলে আরেকটু ভালো ব্যবসা করতে পারতাম।

বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা রিসোর্স ইন্ট্রিগ্রেশন সেন্টার (রিক) এর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিচালক আবুল হাসিব খান জানান, ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পের আওতায় মূলত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীদের কারিগরী সহায়তাসহ মাসিক, ষন্মাষিক ও বাৎসরিক কিস্তিতে ঋণ সহায়তা করে থাকে। প্রান্তিক ভূমিহীন, বর্গাচাষী কৃষকদের ব্যাংক ঋণ না দেয়ায় আমরা তাদের ১৯ শতাংশ হারে কোন জামানত বা শর্ত ছাড়া ঋণ দিয়ে সহযোগীতা করে থাকি। আমাদের এই ঋণ নিয়ে তারা অনেক ভালো আছে। আমরা ঋণ না দিলে তাদের এই ঋণটা নিতে হয় মহাজনদের কাছ যেকোন কিছু বন্ধক রেখে চড়া সুদে। আমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ নেই না যা স্থানীয় মহজনরা নেয়।

পিরোজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি প্রকৌশলী এস এম মনিরুজ্জামান জানান, নাজিরপুর উপজেলার গাওখালী, মনোহরপুর, দেওলবাড়ি ও মালিখালী এই সমস্ত জায়গাগুলোতে সাধারণত দেখা যায় ৫০/৬০ শতাংশ কৃষক এই ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষের সাথে জড়িত। এটা অত্যন্ত লাভজনক একটা পদ্ধতি এবং আমাদের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আমরা বিভিন্ন সময়ে এ সমস্ত চাষীদেরকে উদ্বুদ্ধ করণ ভ্রমণ, বিভিন্ন পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। এছাড়াও আমরা বীজ, সার ও কীটনাশক দিয়ে সহযোগিতা করে থাকি। 

সবসময় আমরা তাদের পাশে আছি এবং আপনারা জানেন যে, কৃষি ঋণ নিতে হলে জামানতের দরকার আছে। যদি জামানত দিয়ে কেউ ঋণের আবেদন করে থাকেন তাহলে আমাদের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে কৃষি ঋণের যে আলাদা শাখা রয়েছে সেখান থেকে তাদের ঋণের ব্যবস্থা করে দিতে পারি।


এসএমএইচ