মহাসড়কে ৬ লেনে উন্নীতকরণসহ ৪ দফা দাবিতে উত্তাল রাজপথ থেকে জাতীয় সংসদ

স্বাধীনতার সাড়ে ৫ দশক পার হলেও বরিশাল বিভাগের কপালে জোটেনি সুষম উন্নয়নের ছোঁয়া। বিশেষ করে স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালুর পর গোটা দক্ষিণাঞ্চলে অর্থনৈতিক বিপ্লবের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এখন ধূলিসাৎ হতে বসেছে একমাত্র সরু মহাসড়কের কারণে। এই তীব্র অবহেলা আর সাম্প্রতিক বাজেটে চরম বঞ্চনার বিরুদ্ধে এবার দলমতনির্বিশেষে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক গণজাগরণ তৈরি হয়েছে বরিশাল বিভাগে।
ভাঙ্গা-কুয়াকাটা মহাসড়ক জরুরি ভিত্তিতে ৬ লেনে উন্নীতকরণসহ ৪ দফা দাবিতে এখন উত্তাল রাজপথ থেকে জাতীয় সংসদ। রাজনৈতিক খোলস ভেঙে এই প্রথম সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী সমাজ এবং সরকারি-বিরোধী দলের সব জনপ্রতিনিধি এক সুতোয় বেঁধেছেন নিজেদের কণ্ঠস্বর।
বরিশাল অঞ্চলের ২১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৮টিতেই এবার জয়ী হয়েছেন বিএনপি ও সমমনা দলের প্রার্থীরা। জনগণের আশা ছিল, বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটে এই অঞ্চলের জন্য বিশেষ বরাদ্দ থাকবে। কিন্তু বাজেটে চরম উপেক্ষিত থাকায় ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণ ঘটে জাতীয় সংসদে। অর্থমন্ত্রীকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন এই অঞ্চলের সংসদ-সদস্যরা।
সংসদে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন:- সংসদে বক্তব্য দেন পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন, বরিশাল-৫ আসনের মজিবর রহমান সরোয়ার, বরিশাল-৩ আসনের অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন, বরিশাল-২ আসনের সরফুদ্দিন সান্টু, ভোলা-১ আসনের আন্দালীব রহমান পার্থ, ভোলা-৪ আসনের নুরুল ইসলাম নয়ন, পিরোজপুর-৩ আসনের রুহুল আমিন দুলাল, পটুয়াখালী-২ আসনের ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, পটুয়াখালী-১ আসনের আলতাফ হোসেন চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন সংসদ সদস্য।
এমনকি ভোলা-বরিশাল সেতুর জন্য কোনো বরাদ্দ না থাকায় খোদ স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ পর্যন্ত সংসদ অধিবেশনে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ ব্যক্ত করেন, যা সংসদীয় ইতিহাসে বিরল।
সংসদের এই ক্ষোভের আঁচ মুহূর্তেই আছড়ে পড়েছে রাজপথে। গত ২৭ জুন রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ঢাকায় বসবাসরত বরিশালের বাসিন্দারা এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। সেখানে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক এমপি মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ সুশীল সমাজের শীর্ষ নেতারা।
অন্যদিকে, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদী এবং বরিশাল নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে চলছে দফায় দফায় সড়ক অবরোধ। গত মঙ্গলবার পটুয়াখালী বাস টার্মিনাল সংলগ্ন সড়কে পটুয়াখালী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির আয়োজনে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া কলাপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দারা বুধবার (১ জুলাই) মহাসড়ক জুড়ে ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক ঐতিহাসিক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা থেকে কুয়াকাটা কিংবা পায়রা বন্দরের দূরত্ব কমলেও, বরিশাল অংশের মাত্র ২৪ থেকে ৩৬ ফুটের সরু সিঙ্গেল লেনের সড়কটি এখন গলার কাঁটা। এই মহাসড়ক দিয়েই চলছে দক্ষিণের ১০ জেলার লাখ লাখ যানবাহন। ধারণক্ষমতার চেয়ে শতগুণ বেশি গাড়ি চলায় প্রতিদিন ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, ঝরছে তাজা প্রাণ।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট এবায়েদুল হক চান বলেন, উন্নয়নের দাবিতে সরকারি ও বিরোধী দলের এমপিদের এভাবে একযোগে সংসদে কথা বলা বরিশাল অঞ্চলের ইতিহাসে এটাই প্রথম। এই সড়ক শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের লাইফলাইন। সড়ক প্রশস্ত না হলে পায়রা বন্দর, কুয়াকাটা পর্যটন কিংবা পটুয়াখালী ইপিজেডে কোনো নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না।
বাজেটে কাঙ্ক্ষিত বরাদ্দ না পেলেও এখনই আশা হারাচ্ছেন না এই অঞ্চলের শীর্ষ নেতারা। বরিশাল সদর আসনের এমপি মজিবর রহমান সরোয়ার অত্যন্ত আশাবাদী কণ্ঠে বলেন, আমরা দলমত ভুলে বরিশাল অঞ্চলের প্রায় সব এমপি এক হয়ে সংসদে কথা বলেছি। এই আন্দোলন কোনো একক দলের নয়, এটি পুরো বরিশালবাসীর বাঁচার লড়াই। আমরা খুব দ্রুতই এই ৪ দফা দাবি নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করব। আমাদের বিশ্বাস, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রাণের এই দাবিগুলো তিনি অবশ্যই বিবেচনা করবেন এবং বিশেষ ব্যবস্থা নেবেন।
দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে বরিশালের সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং সংসদ সদস্যদের অভূতপূর্ব ঐক্যবদ্ধ অবস্থান বাংলাদেশের আঞ্চলিক উন্নয়ন রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন ও গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করল। বরিশালের এই 'অধিকার আদায়ের লড়াই' এখন আর কেবল চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই, তা রূপ নিয়েছে এক মহাসমুদ্রে।
এইচকেআর