বসন্ত জাগ্রত দ্বারে: ঐতিহ্যের রঙে আগামীর আবাহন

বাহাউদ্দিন গোলাপ:
ঋতুচক্রের চিরন্তন আবর্তে প্রকৃতি যখন তার রিক্ত ও ধূসর বিষণ্নতা ঝেড়ে ফেলে নবপত্রপল্লবের সুষমায় সেজে ওঠে, তখনই বাঙালির প্রাণের আঙিনায় পা রাখে ঋতুরাজ বসন্ত। আজ পহেলা ফাল্গুন। শীতের বিদায়বেলায় দখিনা বাতাসের মদির শিহরণ আর কোকিলের উদাস করা কুহুতান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতি কখনো নিঃস্ব থাকে না। ফাগুন কেবল একটি মাসের নাম নয়, বরং এটি বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের এক পলিমাখা মানচিত্র। আজকের এই ডিজিটাল কোলাহল আর কৃত্রিমতার যুগেও যখন পলাশ আর শিমুলের গাঢ় লাল আভা আমাদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়, তখন বোঝা যায় স্থবিরতা ভেঙে প্রাণের অদম্য হিল্লোলই শেষ পর্যন্ত সত্য।
বাঙালির ইতিহাসে ফাগুন মানেই এক অনন্য দ্রোহ আর অমলিন আত্মত্যাগের মহিমা। ১৯৫২ সালের এই লগ্নটি কেবল ঋতু পরিবর্তনের বার্তা আনেনি, বরং রাজপথের ধুলোয় সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারের তপ্ত রক্তের বিনিময়ে লিখে দিয়েছিল এক নতুন মহাকাব্য। তবে ফাগুনের সেই রক্তবীজ কেবল বায়ান্নতেই থমকে থাকেনি; ১৯৬৯-এর ফাগুনে আসাদ-মতিউরের আত্মদান যেমন স্বাধিকারের মন্ত্র জাগিয়েছিল, তেমনি একাত্তরের উত্তাল ফাল্গুন আমাদের পৌঁছে দিয়েছিল স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে। ৭১-এর সেই অগ্নিঝরা ফাগুনেই ধ্বনিত হয়েছিল মুক্তির কালজয়ী আহ্বান, যা পলাশ রাঙা রাজপথকে রূপ দিয়েছিল স্বাধীন মানচিত্রে। এমনকি নব্বইয়ের ফাগুনে ডা. মিলনের রক্তদান আমাদের শিখিয়েছে স্বৈরাচারমুক্ত আগামীর স্বপ্ন দেখতে। তাই বসন্ত আমাদের কাছে কেবল উৎসবের রঙ নয়, বরং প্রতিটি অর্জনে নিজের শেকড় আর অস্তিত্বকে রক্ষার এক শাণিত অঙ্গীকার।
আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিশাল ক্যানভাসে ফাগুন এসেছে এক অমর সঞ্জীবনী হয়ে। চর্যাপদ থেকে আধুনিক কবিতা—সর্বত্রই বসন্তের জয়গান বাঙালির মননশীলতাকে ঋদ্ধ করেছে। কবিগুরুর আধ্যাত্মিক সুন্দরের দুয়ার কিংবা নজরুলের যৌবনের উদ্দাম জয়ধ্বনি—সবখানেই ফাগুন এক অবিচ্ছেদ্য সত্তা। লোকজ বাউল-মরমী গান থেকে শুরু করে চারুকলার বকুলতলা কিংবা রমনার বটমূলে যে অসাম্প্রদায়িক প্রাণের মেলা বসে, তা মূলত বাঙালির হাজার বছরের মানবিক বোধের এক নান্দনিক বিচ্ছুরণ। এই সাংস্কৃতিক প্রবাহই আমাদের আত্মপরিচয়কে সংজ্ঞায়িত করে এবং উগ্রতার বিপরীতে এক উদার সমাজ গঠনের প্রেরণা জোগায়। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় যখন বলেন, "ফুল ফুটুক না ফুটুক / আজ বসন্ত", তখন তা কেবল প্রকৃতির বর্ণনা নয়, বরং যান্ত্রিক নগরে মানুষের বেঁচে থাকার এক অস্তিত্ববাদী লড়াইয়ের জয়গান।
তবে প্রকৃতির এই চিরন্তন রূপান্তর আজ এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনের নিষ্ঠুর প্রভাবে ঋতুচক্রের সেই চিরায়ত ছন্দ আজ কোথাও কোথাও খেই হারিয়ে ফেলছে; বসন্তের সজীবতা আজ উষ্ণায়নের ঝাপটায় ম্লান হওয়ার ঝুঁকিতে। একইসঙ্গে, আজকের স্ক্রিন-নির্ভর যান্ত্রিক জীবনে আমরা যখন ক্রমশ ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতায় একা হয়ে পড়ছি, তখন ফাগুন আমাদের ডাক দেয় এক অকৃত্রিম অনুভূতির জগতে। প্রকৃতি আমাদের শেখায়—ত্যাগের পরেই কেবল প্রাপ্তি আসে। আজকের এই উৎসবের আবহে মানুষের উচ্ছল পদচারণা প্রমাণ করে যে, কৃত্রিম বিচ্ছেদ কখনো প্রাণের স্বাভাবিক গতিকে রুখতে পারে না। এই বসন্ত তাই আমাদের যান্ত্রিক জড়তা কাটিয়ে পুনরায় মানবিক হওয়ার এবং প্রকৃতিকে রক্ষার এক নীরব আহ্বান।
ফাগুনের এই নির্মলতা কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় আটকে রাখার বিষয় নয়। মনের সব জীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা আর ক্ষুদ্রতা দূর করে প্রতিটি হৃদয়ে এক উদার ও মানবিক বোধের চাষাবাদই ঋতুরাজের প্রকৃত আহ্বান। বসন্ত আসুক সব জরা আর গ্লানি মুছে দেয়ার এক ঐশ্বরিক পরশ হয়ে। প্রতিটি হৃদয়ের রক্তরাগে মিশে যাক এক অক্ষয় আশা, যা আমাদের নিয়ে যাবে এক শান্ত ও সুন্দরের পথে। কবিগুরুর সেই অমোঘ সুরের মতো আমাদের জীবনও প্রতিমুহূর্তে গেয়ে উঠুক, "আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে"। ঘৃণা নয়, ভালোবাসাই হোক জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতা—যেখানে প্রতিটি প্রভাতে ফাগুনের রঙে রাঙিয়ে উঠবে এক নতুন ও মানবিক পৃথিবীর গল্প।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী।
ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।