ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম
  • বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও রেফকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর মাদক মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি গ্রেপ্তার পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উজিরপুরে হুইল চেয়ার পেল প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী অয়ন মিত্র  মঠবাড়িয়ায় অস্ত্রের মুখে নারীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ বঙ্গোপসাগরে ৫ দিন ধরে সাগরে ভাসছেন ১৮ জেলে বরিশালে মিছিল নিয়ে এসে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সামনে হাতবোমা বিস্ফোরণ কালাবদর ও তেতুলিয়া নদীতে রাতে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বালু ব্যবসা, প্রশাসন নীরব পটুয়াখালী-ঢাকা রুটে ৫০ টাকা বাড়তি বাসভাড়া নেওয়ার অভিযোগ ভোলায় হাসপাতালে তীব্র সংকটে ওষুধ-সরঞ্জাম, শিশু ওয়ার্ডে পাঁচ গুণ রোগী
  • পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি

    পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    মো. হাসনাইন ॥ 

    প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক চিরন্তন। মানুষ তার জীবনধারণের জন্য প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল, আর প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষের ভূমিকা অপরিসীম। একটি গাছ লাগানো মানে শুধু মাটিতে একটি চারা পুঁতে দেওয়া নয়। একটি গাছ মানে ভবিষ্যতের জন্য ছায়া, অক্সিজেন, জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়, মাটির সুরক্ষা এবং জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার জন্য একটি কার্যকর বিনিয়োগ। সেই উপলব্ধি থেকেই বাংলাদেশ সরকার বৃক্ষরোপণকে জাতীয় পর্যায়ে আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে। 

    সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। বৃক্ষরোপণকে শুধু গতানুগতিক কর্মসূচির মধ্যে না রেখে, বরং জনগণের অংশগ্রহণে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রজন্মগত উন্নয়নের এক সবুজ বিপ্লবে রূপান্তর করা হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ  ও পরোক্ষভাবে ৩.৫ লক্ষাধিক সবুজ কর্মসংস্থান তৈরি হবে, যেখানে নারী, যুবক-যুবতী ও গ্রামীণ জনগণ সমানভাবে অংশ নেবে। একই সঙ্গে ১০,০০০ নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা গড়ে তোলা হবে, যা ২.৫ লক্ষাধিক কর্মসংস্থান তৈরি করবে। 

    সরকার প্রথম ধাপে ২০২৬ সালে ৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ বছরের জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার প্রতিপাদ্য ‘বৃক্ষরোপণে সাজাই দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ শুধু একটি স্লোগান নয়; বরং একটি পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশের স্বপ্নের প্রতিফলন। জুলাই মাসে জাতীয় পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলার কার্যক্রম শুরু হয়। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বৃক্ষরোপণকে একটি জাতীয় আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।

    বৃক্ষরোপণকে বিজ্ঞানসম্মত ও টেকসই করতে চালু করা হবে জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম দ্বারা পরিচালিত ‘জমি তালিকা মানচিত্র, যা উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করবে ও অঞ্চলভেদে বৃক্ষের প্রজাতি নির্ধারণে সহায়তা করবে। প্রতিটি গাছের রক্ষণাবেক্ষণ পর্যবেক্ষণের জন্য চালু হবে একটি ‘ট্রি মনিটরিং অ্যাপ, যা চারাগাছ থেকে পূর্ণবয়স্ক বৃক্ষ হওয়া পর্যন্ত ডিজিটাল নজরদারি নিশ্চিত করবে। 

    নদী, খাল, চর ও মেঘনা মোহনায় নবগঠিত দ্বীপে দ্রুত বৃক্ষরোপণের জন্য ব্যবহৃত হবে বিশেষায়িত ড্রোন প্রযুক্তি, যা দেশব্যাপী সবুজায়নকে তরান্বিত করবে। নগর এলাকায় পার্ক এবং ফুটপাত ও খেলার মাঠের পাশে উপযোগী গাছ লাগানো হবে এবং ভবন নির্মাণ বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে বাধ্যতামূলক ‘সবুজ পরিমাপক’ মানদন্ড। বড় শহরে ‘গ্রীণ বিল্ডিং সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা ও কর-প্রণোদনার মাধ্যমে ছাদ-বাগানসহ বনায়ন উৎসাহিত করা হবে।

    বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা এবং নগরায়ণের চাপ আমাদের পরিবেশের ওপর প্রতিনিয়ত নতুন সংকট তৈরি করছে। 

    এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বিচারে গাছ কাটা, জলাভূমি ভরাট এবং প্রাকৃতিক সবুজ অঞ্চল সংকুচিত হওয়ার প্রবণতা।বিশেষ করে শহরাঞ্চলে বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে। কেননা কংক্রিটের বিস্তার যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে নগরীর তাপমাত্রা। এই বাস্তবতায় বেশি করে গাছ লাগানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন বিদ্যমান গাছগুলো রক্ষা করা। কারণ একটি পরিণত গাছের পরিবেশগত মূল্য একটি নতুন চারার তুলনায় অনেক বেশি।

    প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে দেশজুড়ে বৃক্ষরোপণের উৎসব দেখা যায়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোপণের পর চারার পরিচর্যার দায়িত্ব আর কেউ নেয় না। ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই বহু চারা নষ্ট হয়ে যায়। 

    সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কিন্তু সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি হবে কতটি চারা রোপণ করা হলো, তা নয়; বরং পাঁচ বছর পর কতটি গাছ বেঁচে রইল। তাই প্রয়োজন রোপণের পর পরিচর্যার দিকে মনোযোগ দেওয়া। প্রতিটি চারার জন্য পরিচর্যার দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা, নিয়মিত তদারকি, পানি দেওয়া, গবাদিপশুর হাত থেকে সুরক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বেড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের এই কর্মসূচিকে সফল করতে কোথায় কতটি গাছ লাগানো হলো এবং তার মধ্যে কতটি বেঁচে আছে তার একটি ডিজিটাল তথ্যভান্ডার তৈরি করা যেতে পারে। 

    নতুন গাছ লাগানোর পাশাপাশি পুরোনো বন ও বড় গাছ রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। কারণ নতুন একটি চারা কখনোই রাতারাতি একটি পরিণত বৃক্ষের পরিবেশগত ভূমিকা পূরণ করতে পারে না। সরকারের পক্ষ থেকেও শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, বন উজাড় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। 

    তাই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সঙ্গে বন সংরক্ষণ, অবৈধ বৃক্ষনিধন প্রতিরোধ, জলাভূমি রক্ষা এবং নগর সবুজায়নের সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি।  সরকার একা ২৫ কোটি গাছ লাগিয়ে তা রক্ষা করতে পারবে না। এই বিশাল কর্মসূচিকে সফল করতে প্রয়োজন জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। প্রতিটি পরিবার বছরে অন্তত একটি গাছ লাগাতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিতে পারে ‘এক শিক্ষার্থী, একটি গাছ’ উদ্যোগ। 

    সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের নিজস্ব জায়গায় বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি রাস্তার পাশ, খালপাড় ও উন্মুক্ত জায়গায় সামাজিক বনায়নে অংশ নিতে পারে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন ও তরুণদের সম্পৃক্ত করা গেলে বৃক্ষরোপণ একটি সরকারি কর্মসূচির সীমা ছাড়িয়ে  সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।

    তবে এজন্য আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনতে হবে। বছরে একদিন গাছ লাগিয়ে ছবি তুলে দায়িত্ব শেষ করার সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে বৃক্ষরোপণের আসল সাফল্য চারা রোপণের দিনে নয়, সেই চারা যখন বড় হয়ে ছায়া দেবে তখন। তাই সরকারের এই প্রশংসনীয় উদ্যোগ হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ ব্যবস্থাপনার একটি অংশ। প্রতিটি রোপিত গাছের জীবন, পরিচর্যা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হবে। আজ আমরা যে চারা রোপণ করছি, তার ছায়ায় হয়তো আমরা সবাই বসতে পারব না কিন্তু আমাদের সন্তানরা বসবে। তাদের সন্তানরাও বসবে। 

    সবুজ প্রকৃতি ছাড়া সুস্থ ও নিরাপদ পৃথিবী কল্পনা করা কঠিন। জলবায়ু পরিবর্তন,  বায়ুদূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, ভূমিক্ষয় ও জীববৈচিত্র্যের সংকট মোকাবিলায় বৃক্ষ আমাদের অন্যতম শক্তিশালী প্রাকৃতিক সহযোদ্ধা। সবুজ বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব সরকারের যেমন, তেমনি প্রতিটি নাগরিকেরও। একটি গাছ কেবল একটি গাছ নয়, এটি একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। তাই পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণ কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়, এটি হোক ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।  

    (লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, বরিশাল, তথ্য অধিদফতর)।  


     


    এইচকেআর
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ